খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৫ আশ্বিন ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

মাসিক তকবীর ও ভাষা সৈনিক শরীফ আমজাদ

শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন   | প্রকাশিত ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০১:০৯:০০

মাসিক তকবীর ও ভাষা সৈনিক শরীফ আমজাদ

ভাষা আন্দোলনের প্রথম অধ্যায় আটচল্লিশ সালে। পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠির স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সাড়ে চার কোটি বাঙালির প্রথম প্রতিবাদ ‘উর্দু নয়, রাষ্ট্রভাষা বাংল চাই’। কুমিল্লার গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন। আটচল্লিশের পঁচিশ ফেব্র“য়ারি করাচীতে আইনসভায় এ দাবি প্রথম উচ্চারিত হয়। তিনি কংগ্রেসের আদর্শ ও দর্শনে বিশ্বাসী। সচেতন মহলে এ নিয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে। তার ঢেউ এসে পৌঁছায় খুলনার দৌলতপুর বিএল কলেজে। আটচল্লিশ সালের ছাব্বিশ ফেব্র“য়ারি বাংলা ভাষা আন্দোলন শুারু হয়। 
সে সময়কার ছাত্রলীগ নেতা, ভাষা সৈনিক তাহমীদ উদ্দীনের লেখা থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়। আটচল্লিশ সালের উনত্রিশ ফেব্র“য়ারি দৈনিক আজাদে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, উনত্রিশ ফেব্র“য়ারি তারিখে খুলনা, দিনাজপুর, পাবনা ও মুন্সীগঞ্জে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। খুলনার দৌলতপুরে আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় গৃহিত প্রস্তাবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো হয়। আটচল্লিশ সালের ছাব্বিশ ফেব্র“য়ারি তিনটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে বিএল একাডেমী ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় (স ম বাবর আলী রচিত মহান একুশে স্মরণিকা-২০১৫)। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গড়ে ওঠা কেন্দ্রীয় সংগ্রাম পরিষদ আটচল্লিশ সালের ১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের ১৭ জেলায় হরতাল আহ্বান করে (সিরাজ উদদীন আহমেদ রচিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান)। কর্মসূচি সফল করতে মার্চের প্রথম সপ্তাহে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য, ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান খুলনায় আসেন (অসমাপ্ত আত্মজীবনী শেখ মুজিবুর রহমান)। তাঁর আগমন উপলক্ষে দৌলতপুর বিএল একাডেমীতে ছাত্রসভার আয়োজন করা হয়। মুসলিম লীগ সমর্থকরা মারপিট করলেও তিনি ছাত্রসভায় বক্তৃতা করেন। 
দৈনিক আজাদ ও সংবাদে মাঝে মধ্যে খুলনার ভাষা আন্দোলনের সংবাদ প্রকাশিত হয়। ১৯৪৮-৫২ পর্যন্ত ভাষা সংশ্লিষ্ট যে আন্দোলন দানাবেধে ওঠে সেক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করে স্থানীয় মাসিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকাগুলো।
পঞ্চাশ সালের আগস্ট মাসে তকবীর নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। খুলনার সাংবাদিকতার পথিকৃত দৌলতপুরের শরীফ আমজাদ হোসেন পত্রিকাটি সম্পাদনা করতেন। ম্যাগাজিন সাইজের এ পত্রিকা প্রথমে ফেরীঘাট মোড়স্থ মুসলিম স্কলার প্রিন্টিং ওয়ার্কস থেকে পরে আইডিয়াল প্রেস থেকে ছাপা হতো। 
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে মাসিক তকবীরের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়। দক্ষিণ জনপদের সংকট সমস্যা, রাজনৈতিক প্রসঙ্গ বিশেষ করে বাঙালী জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটাতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার পক্ষে মাসিক তকবীর ভূমিকা নিয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ছাত্র ফেডারেশনের নেতা সরদার আনোয়ার হোসেন পুলিশের হাতে গ্রেফতার হলে ছাত্রসমাজ যে প্রতিবাদ মুখর হয়ে ওঠে তার ওপর বিস্তারিত প্রতিবেদন ছিল মাসিক তকবীরের পাতায়। ভাষা আন্দোলনের প্রথম দিকে মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর বিবৃতি দিয়ে আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিলেও পরে তার বিবৃতি প্রত্যাহার করেন। খুলনা মুসলিম লীগ অধ্যুষিত এলাকা হলেও ভাষা আন্দোলনের বিপক্ষে খান এ সবুরের অবস্থান নেওয়াকে মাসিক তকবীর নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে। সম্পাদক শরীফ আমজাদ হোসেন স্পষ্টবাদী। এ কারণে তার সুনাম ছিল। সম্পাদকীয় লেখা হত ঈদ উৎসব, বিদ্যুৎ সমস্যা, ভৈরব নদীর ভাঙন, দক্ষিণাঞ্চলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (তদানিন্তন ওয়াপদা) বাঁধের ভাঙন এবং ভাষার দাবি নিয়ে। এ পত্রিকার জনপ্রিয় কলাম ছিল, ‘নীল চশমার ফাঁকে’, সম্পাদক নিজেই এ কলামটি লিখতেন। পত্রিকার লেখনীতে মুসলিম লীগ সরকারের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের সমালোচনা থাকতো। খুলনায় ভাষা আন্দোলনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টিতে মাসিক তকবীরের ভূমিকা ছিল সহায়ক। 
শরীফ আমজাদ হোসেন নড়াইল জেলার কালিয়া থানার কাকশিয়ালী গ্রামে ১৯১৬ সালে জন্মগ্রহষ করেন। তিনি শিক্ষক, সমাজকর্মী ও গণমাধ্যম কর্মী। তিনি খুলনার সাংবাদিকতার পৃথিকৃৎ। ১৯৪২ সালে কলকাতায় নবযুগ পত্রিকার সাথে সম্পৃক্ত হন। তার সাংবাদিকতার উদ্দেশ্যে ব্রিটিশের শাসন শোষণ ও সাম্প্রায়িকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানানো, এর পক্ষে জনমত গঠন সৃষ্টি করা। 
প্রতিবাদী ভূমিকার জন্য প্রথিতযশা সাংবাদিক মাওলানা আকরাম খাঁ এবং মাওলানা আহমদ আলীর কাছে তিনি ছিলেন স্নেহভাজন। ১৯৪৭ সালের পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর খুলনায় আসেন। ১৯৫০ সালের আগস্ট মাসে মাসিক তববীর নামে পত্রিকার সম্পাদনা করেন। এই পত্রিকায় নীল চশমার ফাকে নামে নিয়মিত কলাম লিখতেন। সাংবাদিকতায় তিনি স্পষ্টবাদী। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। সে সময় খুলনা শহরে উল্লেখযোগ্য কোন পত্রিকা ছিল না। ঢাকার কাগজের ওপর খুলনার পাঠক নির্ভরশীল ছিল। ১৯৬৩ সালে ঢাকা থেকে দেশবার্তা ১৯৬৯ সালে খুলনা থেকে নবযুগ নামে পত্রিকার সম্পাদনা করেন। এছাড়া দৌলতপুর থানার (আজকের দিঘলিয়া) সেনহাটী হাইস্কুল, ডুমুরিয়া থুকড়া হাইস্কুল ও ফুলতলা দামোদর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। ১৯৬৭ সালে আফিল উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পাবলার সবুজ সংঘ মাঠ এবং ১৯৬৯ সালে দৌলতপুর দিবা নৈশ কলেজ প্রতিষ্ঠায় অনন্য অবদান রাখেন। ১৯৮৭ সালের ৬ জানুয়ারি ইন্তেকাল করেন। তার স্মৃতি রক্ষাতে পাবলা মেইন রোডের নামকরণ করা হয় শরীফ আমজাদ হোসেন সড়ক। তার পাঁচপুত্রের মধ্যে শরীফ আনোয়ারুল হামিদ দুলু, সাংবাদিকতায় শরীফ ইফতেখারুল হামিদ, সাংবাদিকতায় শরীফ বদরুল হামিদ বাদল ব্যাংকার, শরীফ শফিকুল হামিদ চন্দন রাজনীতিক ও শরীফ ইকবাল হামিদ ব্যাংকার।
(লেখক ঃ রাজনীতিক ও সমাজসেবী)


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বদলে যাবে মংলা বন্দর

বদলে যাবে মংলা বন্দর

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০১













ব্রেকিং নিউজ



আজ-কালের মধ্যে  বৃষ্টির সম্ভাবনা 

আজ-কালের মধ্যে  বৃষ্টির সম্ভাবনা 

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০১:০৫







মাইলফলকের সামনে মাশরাফি

মাইলফলকের সামনে মাশরাফি

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:৫৩