খুলনা | শুক্রবার | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৫ আশ্বিন ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

১৯৫২ সাল এবং আমাদের ভাষা আন্দোলন

ওমর খালেদ রুমিক্ষ | প্রকাশিত ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০১:০৭:০০

The Bengalis were a community prior to their demand for self-determination. No over-arching ideology such as Islamic doctrine was necessary to bind them to one another. -- Lawrence Ziring.
ভাষা আন্দোলনের কথা মনে পড়লেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ১৯৫২ সালের দৃশ্যপট। কিন্তু আমরা ভুলে যাই এই ভাষার প্রশ্ন প্রথম উল্লিখিত হয় ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের ঠিক আগেই। কলকাতা কেন্দ্রিক বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা পাকিস্তানের ভাষার প্রশ্নে তখনই চিন্তিত হয়ে পড়ে। কারণ আর কিছুই নয়। পাকিস্তানের পূর্ব প্রান্তের ভাষা বাংলা। আবার তারা সংখ্যা গরিষ্ঠও। পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা ছিলো উর্দু। আবার তা শাসক গোষ্ঠীয় ভাষা। এরকম একটা জটিল পরিস্তিতিতে উভয় প্রান্তের মানুষের কাছে ভাষার প্রশ্ন বেশ বড় হয়ে দেখা দেয়। পাকিস্তানের ব্যাপারে এরকম সমস্যা আরও হয়েছিল। যেমন পাকিস্তান জন্মের পর নয় বছর লেগেছিল এর সংবিধান প্রণয়ন করতে।
১৯৪৭ সালের আগস্টে দেশ ভাগের পরপরই তাই দেখা যায় কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তরিত হওয়া বুদ্ধিজীবীরা এখানে এসেই তমদ্দুন মজলিস গঠন করলেন। আর এই তমদ্দুন মজলিসই ভাষার প্রশ্নে প্রথম সোচ্চার হয়। তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীরা তমদ্দুন মজলিসের ব্যানারে তাদের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন। ড. কাজী মোতাহার হোসেন চৌধুরী, ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহর মতো শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীরা এই কাতারে শরিক হন। পরবর্তীতে ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের জন্ম হলে ভাষা আন্দোলন আর সামাজিক আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাজনীতির হাত ধরে ভাষার প্রশ্ন রাজপথ ধরে সামনে আগাতে থাকে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত এই ৪ বছর অব্যাহত আন্দোলনের মাধ্যমে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্র“য়ারী অর্থাৎ ৮ ফাল্গুনের কৃষ্ণচূড়ার রংধরা বিকেলে অজস্র শহীদের রক্ত স্নাত হয়ে ২১ ফেব্র“য়ারি আমাদের প্রাণের সম্পদে পরিণত হয়। ২১ ফেব্র“য়ারির সেই বিকেলে যে রক্ত বয়ে গিয়েছিলো তার স্রোতও সেদিন ভাষার প্রশ্নের সমাধান আনতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা এরপরও প্রায় ৪টা বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। অবশেষে ১৯৫৫ সালে এসে আমরা সাংবিধানিক ভাবে ২১ ফেব্র“য়ারির স্বীকৃতি পাই। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নেওয়া হয়।
মূলতঃ ১৯৪৪ সালের দিকেই কলকাতায় বসবাসরত বাঙালি দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীরাই বাংলা ভাষার অবস্থান নিয়ে সোচ্চার হতে শুরু করে। বিষয়টি যে বেশ গুরুত্বপূর্ণ তা আর একবার প্রমাণিত হয় যখন সম্ভবতঃ ১৯৪৭ সালের মাঝামাঝির দিকে হায়দ্রাবাদে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সর্বশেষ অধিবেশনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে বলে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। প্রস্তাবটি এনেছিলেন চৌধুরী খালেকুজ্জামান। তখন অবশ্য এ নিয়ে বাঙালিদের মাথা ঘামানোর অতটা দরকার পরেনি। কারণ পাকিস্তান তখনো তার বীজের মধ্যে নিহিত। আর তার পাশাপাশি শরৎচন্দ্র বসু ও হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দী যুক্ত বাংলা গঠনের চেষ্টাতে ছিলেন।
অবশ্য তাদের স্বাধীন যুক্ত বাংলা গঠনের আন্দোলন ভেস্তে যায়, গান্ধী ও তার কংগ্রেসের অনমনীয় ভূমিকার জন্য। অবশ্য এর পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল কাহীরী ব্রাহ্মণ গোত্রীয় সফল রাজনীতিবিদ পন্ডিত জওহর লাল নেহেরুর। তিনিই গান্ধীকে তার মত করে বুঝিয়ে ছিলেন। সাথে ছিল আরও বেশি অনমনীয় বলে পরিচিত বল্লব ভাই প্যাটেল এবং আরও কিছু তাদের সমগোত্রীয় আজীবনের অনমনীয় কট্টর নেতৃবৃন্দ। যা হোক শেষ পর্যন্ত যা হবার তাই হয়ে ছিল। ইতিহাস তার গর্ভ থেকে একটি দুই মাথাওয়ালা সন্তান পাকিস্তান প্রসব করে।
সব মিলিয়ে প্রাথমিক পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে ভাববার মত অবকাশ তখন বাঙালিদের ছিল বলে মনে হয় না, কিন্তু ঝামেলা বাঁধল তখনি যখন ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট সত্যি সত্যি পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হল। ভাষার এই বিষয়টিই দিন দিন কেন জানি কাবাবের হাড্ডির মতোই বাঙালির গলায় বিঁধতে শুরু করে। ১৯৪৭ সালের ৫ আগস্ট গণতান্ত্রিক যুবলীগ নামে যে একটি ধর্ম নিরপেক্ষ সংগঠন গড়ে উঠেছিল তারাও বাঙালিদের সরকারি ও নিত্য নৈমিত্তিক অন্যান্য কাজের ভাষা হিসাবে বাংলাকেই দাবি করে। পরবর্তীতে ঐ বছরেরই ১ সেপ্টেম্বর ইসলামপন্থী চরিত্র নিয়ে গঠিত তমদ্দুন মজলিসও বাংলা ভাষার প্রশ্নে তাদের দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে এবং ঐ মাসেরই ১৫ তারিখে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশ করে। 
সবকিছুর সাথে ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠিত পূর্বপাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নামক একটি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন বাংলা ভাষার পক্ষে জোরালো দাবি উপস্থাপন করে। এসবই ঠিকঠাক মতোই চলছিল। কিন্তু পুরো ব্যাপারটাই আগুনে ঘি দেওয়ার মতো হয়ে গেল যখন ১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ জীবনের প্রথম পূর্ববঙ্গ সফরে এসে ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা করার কথা ঘোষণা করেন। 
জিন্নাহর মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে এই ঘটনা প্রশমিত হলেও সেই আগুন আবার জ্বলে উঠল ১৯৫২ সালের ২৬ জানুয়ারি পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা করার ঘোষণা দিলে। এই ঘোষণার সাথে সাথেই ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে সর্বদলীয় রাষ্ট ভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়। আন্দোলন সংগ্রামের এক পর্যায়ে ২১ ফেব্র“য়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করতে গেলে পুলিশের গুলিতে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার ও অজিউল্লাহ শহিদ হয়। ২১ ফেব্র“য়ারি তাই মহান আত্মত্যাগের দিন। বাঙালির জাতীয় ও রাজনৈতিক দিনপঞ্জীর ইতিহাসে সব চেয়ে উজ্জ্বলতম দিনগুলোর একটি এই একুশের চেতনাই বাঙালির অন্তরে স্বাধীনতার চেতনার জন্ম দিয়েছিল। অবশ্যই এর পরও ভাষা নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানীরা অনেক তালবাহানা করলেও অবশেষে ১৯৫৪ সালের ১৯ এপ্রিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়।
(লেখক : কবি, ঔপন্যাসিক ও ছোটোগল্পকার)
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বদলে যাবে মংলা বন্দর

বদলে যাবে মংলা বন্দর

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০১













ব্রেকিং নিউজ




আজ ১০ মহররম পবিত্র আশুরা 

আজ ১০ মহররম পবিত্র আশুরা 

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:৫৮

কেসিসিতে আজ ও কাল সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল

কেসিসিতে আজ ও কাল সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:৫৭





খুলনায় সেঞ্চুরিতে নজর কাড়লেন সোহান

খুলনায় সেঞ্চুরিতে নজর কাড়লেন সোহান

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:৫০


অভিষেকেই আবু হায়দার রনির চমক

অভিষেকেই আবু হায়দার রনির চমক

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:৪৫