খুলনা | শুক্রবার | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৫ আশ্বিন ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

মাতৃভাষা, রাষ্ট্রভাষা ও জাতিরাষ্ট্র

মোঃ আমিরুল ইসলাম (বাবু)  | প্রকাশিত ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০১:০৫:০০

বায়ান্নর একুশে ফেব্র“য়ারির শহিদদের আত্মদান সার্থক হয় এবং শহিদদের আত্ম শান্তি পায় ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ যেদিন পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলা অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তাঁদের আত্মা দ্বিতীয়বার শান্তি পায় ২০০০ সালে, তখন জাতিসংঘ একুশে ফেব্র“য়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। এখন আমরা এই দিনটি শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস দু ভাবেই পালন করি, অন্যান্য দেশ করে শুধু আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। এর অর্থ হলো এই যে, একুশে ফেব্র“য়ারির মহিমা বাংলাদেশের বাঙালিদের কাছে পৃথিবীর অন্য যে কোনদেশের চেয়ে হাজার গুণ বেশি। 
কোনো দেশের মানুষ রাষ্ট্রভাষার জন্য আন্দোলন তখনই করে, যখন তাদের থাকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টের আগে এই উপমহাদেশের মানুষের মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা ছিল, কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না। তখন বিদেশি ঔপনিবেশিক সরকার তাদের সরকারি কাজকর্ম চালাত তাদের নিজেদের ভাষা ইংরেজিতে। এ দেশের মানুষকেও সরকারের সঙ্গে সব রকম যোগাযোগ ইংরেজিতেই করতে হতো। যে শিক্ষিত মানুষটি সরকারি চাকুরিতে নিযুক্ত হতেন, তাঁকে ইংরেজি ভাষা অতি অবশ্যই জানতে হতো। তাঁর মাতৃভাষা যা-ই হোক, সে ভাষা যত সমৃদ্ধই হোক, সরকারের তা কোনো কাজেই আসত না। রবীন্দ্রনাথ নাইট খেতাব বর্জন করার সিদ্ধান্ত জানিয়ে ব্রিটিশ সরকার বরাবর চিঠি লিখেছিলেন বিজাতীয় ভাষা ইংরেজিতে, তাঁর প্রিয়তম মাতৃভাষা বাংলায় নয়। আশির দশক থেকে ফেব্র“য়ারি মাস এলেই বাঙালির একটি গোত্রের আবেগ উতলে ওঠে। অথচ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আবেগের ব্যাপার ছিল না। তা ছিল অতি যুক্তিপূর্ণ ও বাস্তববাদী আন্দোলন। সে আন্দোলনে যারা পাকিস্তানি শাসকদের রাইফেলের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন, তাঁরা ছিলেন নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ, পূর্ব বাংলার জনগণের ৯০ শতাংশের প্রতিনিধি। 
প্রতিদিন অব্যাহতভাবে অজস্র কণ্ঠে বলা হচ্ছে, প্রথিবীতে একমাত্র (বাংলাদেশের) বাঙালি ভাষার জন্য জীবন দিয়েছে। সঠিক তথ্য হলো, পৃথিবীর আরও অনেক জাতি ভাষা নিয়ে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করেছে এবং জীবন দিয়েছে। ভারতের আসাম প্রদেশে বাংলা ভাষার জন্য ১১ জন জীবন দিয়েছিলেন। তামিলনাড়তে তামিল ভাষার জন্য যে রক্তপাত ঘটেছে, পৃথিবীতে তা নজিরবিহীন। সেটাও এক ফেব্র“য়ারি মাসে। ১৯৬৫ সালের ১১ ফেব্র“য়ারি মাদ্রাজে (চেন্নাই)  এক পুলিশ জীবন্ত দগ্ধ এবং ১১ জন গুলিতে নিহত হন। আহত ৬০ জন। পরদনি খাদ্যমন্ত্রী মি সুব্রামানিয়াম এবং পেট্টোলিয়ামমন্ত্রী ও ভি ওলিগানা পদত্যাগ করেন। ১৩ ফেব্র“য়ারি পুলিশ ও জনতার সংঘর্ষে ১০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হন। সেনা মোতায়েন করা হয়। কিন্তু মাতৃভাষার জন্য আন্দোলনকারীরা রাস্তায় থাকেন। ১৪ ফেব্র“য়ারি সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন ২৪ জন। আহত ৩০ জন। ১৯ ফেব্র“য়ারি ডিএমকে নেতা মি. মনোহর ঘোষণা করেন, এক সপ্তাহে ভাষার জন্য নিহত হয়েছেন ১৫০ জন। সুতরাং মাতৃভাষা মানুষের এতই প্রিয় যে তার জন্য অকাতরে জীবন দিতে দ্বিধা করে না বহু জাতি।
মনে হয়, ফেব্র“য়ারি ভাষা আন্দোলনেরই মাস। ১৯৯৩-এর ফেব্র“য়ারি তামিলনাড়–তে হিন্দির বিরুদ্ধে হাজার হাজার তামিল আন্দোলনে রাস্তায় নামেন। তারা হিন্দিতে লেখা নামফলক প্রভৃতি মুছে দিচ্ছিলেন। দ্রাবিড় মুনেত্রা কাজাঘাম (ডিএমকে) দলের নেতা-কর্মীসহ ১৫ হাজার গ্রেপ্তার হন। দলের মুখপাত্র কে. বীরমনি অভিযোগ করেন, দূরদর্শনে গুরুত্বপর্ণূ তারিল অনুষ্ঠানের পরিবর্তে কম গুরুত্বপূর্ণ হিন্দি অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। 
আমাদের ১৯৪৭-৫২-এর রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বহুমাত্রিকতা ছিল। সেটা ছিল অর্থনৈতিক আন্দোলন এবং স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে একটি পরিপূর্ণ গততান্ত্রিক আন্দোলন। গণতান্ত্রিক আন্দোলন ছিল বলেই পাকিস্তানি আমলাতান্ত্রিক স্বৈরশাসকদের পক্ষে সেই আন্দোলন বলপ্রয়োগ করে দমন করা খুবই স্বাভাবিক ছিল। কারণ, পশ্চিম পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় শাসকদের মাথা যত মোটাই হোক, এটুকু বেঝার ক্ষমতা তাদের ছিল যে, এই ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করেই জাতীয়তাবদী আন্দোলন গড়ে উঠবে। এবং সেই জাতীয়তাবাদী আন্দোলন পাকিস্তানের ইসলামি জাতীয়তাবাদের ভিত দুর্বল করে দেবে, সে জন্য আন্দোলন গতটা শক্ত ছিল, তা দমনের প্রক্রিয়া ছিল তার চেয়ে বহুগুণ আক্রমণাত্মক। 
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন নিয়ে যোগ্য গবেষকদের লেখা বহু বই প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং সে সম্পর্কে কিছুই আর জানতে অবশিষ্ট নেই। নতুন কিছু জানার নেই বলেই অনেক অপ্রাসঙ্গিক কথা বলা হচ্ছে। একুশের প্রাসঙ্গিকতা চাপা পড়ে যাচ্ছে। সেইদন আন্দোলন হয়েছিল রাষ্ট্রভাষার দাবিতে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি চাই এ রকম কোনো দাবিতে নয়। কোনো ভাষা আন্দোলনের বহু আগে মাইকেল মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত হয়েছেন। নজরুল নিস্তব্ধ হয়েছেন। জসীমউদ্দীনের শ্রেষ্ঠ রচনা বায়ান্নর আগের। বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদের সঙ্গে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক নেই। তবে এখন যে ফেব্র“য়ারির চার সপ্তাহে কয়েক হাজার নতুন বই একুশের বইমেলায় আসে অনেকের ধারণা, সেটা একুশের কারণে।
মাতৃভাষা ‘মাতৃদুগ্ধসম’ কথাটি ১০০ ভাগ সত্য। কিন্তু এ কথাও সত্য যে, মাতৃদুগ্ধপান করে মানুষ বছর দুই বাঁচতে পারে; ৬০, ৭০,৮০ বছর বাঁচার জন্য তার আরও নানা রকমের পুষ্টির খাদ্য প্রয়োজন। জ্ঞান অর্জন ও সৃষ্টিশীলতার জন্য মাতৃভাষার বাইরে সারা দুনিয়া পড়ে রয়েছে। অনেকেই মাতৃভাষার সাহিত্যচর্চা বা জ্ঞানচর্চা করেন না। অমর্ত্য সেনের অমূল্য রচনা সব ইংরেজিত, মাতৃভাষায় নয়। অরুন্ধতী রায় তাঁর মাতৃভাষায় লেখেন না। খুশবন্ত সিং তাঁর মাতৃভাষা পাঞ্জাবিতে নয়, সাহিত্যচর্চা করেছেন ইংরেজিতে। এখন ভারত ও আফ্রিকার বহু প্রধান লেখক তাঁদের মাতৃভাষায় নয় ইংরেজি স্প্যানিশ বা ফরাসিতে সাহিত্যচর্চা করেন। পৃথিবীতে ভাষা এখন অন্তত ছয় হাজার। এই ছয় হাজার ভাষাভাষীর মাত্র ১ শতাংশ তাঁদের আমাদের বাঙালির ক্ষেত্রে তা নয়। ভাষাভাষী হিসেবে আমাদের রোল নম্বর পাঁচ, ৬০০০-এর মধ্যে। আমাদের ভাষার কবি ১০৪ বছর আগে নোবেল পুরঙ্কার পেয়েছেন। প্রায় ৩০ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। সতরাং বাংলা ভাষার অগ্রযাত্রার সম্ভাবনা অপার। 
একুশের সঙ্গে সাহিত্যের সম্পর্ক নেই। একুশের সঙ্গে সম্পর্ক জাতিরাষ্টের। পাকিস্তানের রাষ্টীয় কাঠামোর ভেতর ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বায়ান্নর একুশে ফেব্র“য়ারি একটি মাইলফলক। তার পরেই দিনটি হয়ে যায় বাঙালি মুসলমানের জাতিগত আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার আঁদায়ের সংগ্রামে অপরিমেয় প্রেরণা।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বদলে যাবে মংলা বন্দর

বদলে যাবে মংলা বন্দর

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০১













ব্রেকিং নিউজ




আজ ১০ মহররম পবিত্র আশুরা 

আজ ১০ মহররম পবিত্র আশুরা 

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:৫৮

কেসিসিতে আজ ও কাল সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল

কেসিসিতে আজ ও কাল সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:৫৭





খুলনায় সেঞ্চুরিতে নজর কাড়লেন সোহান

খুলনায় সেঞ্চুরিতে নজর কাড়লেন সোহান

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:৫০


অভিষেকেই আবু হায়দার রনির চমক

অভিষেকেই আবু হায়দার রনির চমক

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:৪৫