খুলনা | সোমবার | ২২ অক্টোবর ২০১৮ | ৭ কার্তিক ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

ঘটনাস্থলের কাছেই ছিল পুলিশ : কলেজ অধ্যক্ষের দাবি : ‘সহপাঠীকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় রাজিন হত্যা’

খুলনা পাবলিক কলেজ কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি ছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত ২২ জানুয়ারী, ২০১৮ ০০:২০:০০

সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র ফাহমিদ তানভির রাজিন হত্যাকান্ডে খুলনা পাবলিক কলেজ কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তার ব্যবস্থার অবহেলাকেই দায়ী করছেন সকলেই। কলেজের ৩১তম বর্ষপূর্তি ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে মঞ্চের পাশে এ ঘটনা ঘটে। ফলে গতকাল রবিবার ‘টক অব দ্যা খুলনা’ ছিল পাবলিক কলেজের উদাসীন নিরাপত্তা ব্যবস্থার আলোচনা-সমালোচনা। খুলনা পুলিশ লাইন স্কুলের ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী মৌমিতাকে উত্ত্যক্তে বাধা দেয়ায় প্রতিশোধ নিতেই রাজিনকে চুরিকাঘাত করে উত্যক্তকারীরাই। নিহতের নিকট আত্মীয়, এলাকাবাসী, সহপাঠী ও প্রশাসনের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। মেধাবী ছাত্র ফাহমিদ তানভির রাজিন বড় হয়ে পৈতৃক জমিতে একটি হাসপাতাল নির্মাণ করে মানুষের সেবা করতে চেয়েছিল। এ জন্যেই হয়তো গতকাল জোহরবাদ তার প্রথম নামাজে জানাজায় ছিল বিশাল জমায়েত। আর নগরীর বড় বয়রার ১২৮/৩ পালপাড়া সড়কের রাহিন মঞ্জিলের ও সামনের সড়কে প্রতিটি মানুষ ছিল অশ্র“সিক্ত। গতকাল সন্ধ্যায় পাইকগাছা উপজেলার হিতামপুর গ্রামে মরহুমের ২য় নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়।
নিহত রাজিনের মা পুলিশ লাইন স্কুলের শিক্ষক রেহেনা খাতুন বলেন, “তিন জায়গায় প্রাইভেট পড়তে যেতো রাজিন, আমাদের প্রতিবেশী মৌমিতা আর ওই ফাহিম ইসলাম মনি। ব্যাচে ক’দিন পড়ার পর থেকে মৌমিতাকে বিরক্ত করতো ফাহিম। আমার আব্বা রাজিন এসবের প্রতিবাদ করতো। বাসায় এসে কয়েক দিন এসব কথা আমাকে বলেছিলও। তারপর মৌমিতার মা আমার সহকর্মী কারিমা ম্যাডাম। তিনি বললেন, মৌমিতাকে তুমি (রাজিন) সাথে করে নিয়ে যাবা, আবার নিয়ে আসবা। ওরা ভাই-বোনের মতোই এক সাথে যাতায়াত করতো। একই ক্লাসে পড়তো ওরা। মৌমিতাকে বিরক্ত করলে রাজিন বাধা দিতো। এজন্য প্রতিশোধ নিতেই রাজিনকে খুন করেছে ফাহিম, রয়েল, সানি, আসিফ, জিসান, তারিন হাসান রিজভীসহ ৮/১০ জনে মিলে। পাবলিক কলেজের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে মডেল স্কুলের ছাত্ররা কি করে ঢুকলো? নিরাপত্তা দিতে পারবে না, তাহলে সে রকম প্রোগ্রাম কেন করলো? আমার আব্বা রে কেন খুন করালো ওরা?” এসব কথার মধ্যে কিছুক্ষণ পরপর মুর্ছা যাচ্ছিলেন তিনি। সর্বশেষ কথা অপূর্ণ রেখেই জ্ঞান হারালেন সন্তানহারা মা রেহেনা খাতুন।
কিছুক্ষণ পর তিনি আবারও বলতে শুরু করেন। তিনি বললেন, “রাজিন খুব মেধাবী ছাত্র ছিল। সে টানা পাঁচবার ক্লাসের নম্বর ওয়ান ক্যাপ্টেন। আমার ক্যাপ্টেন, আমার ফ্যালিমি ক্যাপ্টেন হারা হয়ে গেল রে।” কথা শেষ না করে আবারও মুর্ছা গেলেন মা রেহেনা খাতুন।
নিহতের পিতা মংলা বন্দরের অবসরপ্রাপ্ত স্টোরকিপার শেখ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “আমার ছেলে হত্যার জন্য প্রথম দায়ী পাবলিক কলেজের নিরাপত্তা অব্যবস্থাপনা। মঞ্চের পাশে কিভাবে ফাহিম, রয়েল, সানি, আসিফ, জিসান, তারিন হাসান রিজভীরা চুরি মারতে পারলো? ওখানে কেউ ছিলেন না। পুলিশ ছিল না? বহিরাগতরা কিভাবে ঢুকলো স্কুলে?”
নিহতের একমাত্র ভাই নগরীর একটি প্রাইভেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্র ফারহান তানভীর রাহিন বলেন, “আমার ছোট ভাইটার কোন বদ অভ্যাস ছিল না। বাজে সঙ্গ বা আড্ডা ছিল না। স্কুল ও ব্যাচে পড়াশুনার বাইরে শুধু আমার কম্পিউটারে বসে গেমস্ খেলতে পছন্দ করতো। ও খুব মেধাবী ছাত্র ছিল, কোন বিষয় এক/দু’বারের বেশি পড়া লাগতো না তার। আমাদের একটা জমি আছে, ও চাইতো বড় হয়ে রাজিন হাসপাতাল নির্মাণ করে মানুষের সেবা করতে চাইতো। প্রায় মা-বাবা বলতো, দেখে নিও মা আমি ওই জমিতে হাসপাতাল তৈরি করবো।”
নিহতের নিকট আত্মীয় শেখ সাদিকুল ইসলাম সাদি বলেন, “মঞ্চের একেপারে পাশেই দাঁড়িয়ে রাজিনের বুকে চুরি মেরে পাবলিক কলেজের ২নং গেট দিয়ে বেরিয়ে গেল! সে সময় কি পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবক কেউ নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন না? যদিও কেউ থেকে থাকেন, তাহলে কেন তাদের আটক করা হলো না? এতো বড় আয়োজনে নিরাপত্তা ব্যবস্থাটা কেন এতো অবহেলিত? এ হত্যাকান্ডের দায় কি কলেজ কর্তৃপক্ষ এড়িয়ে যেতে পারেন?”
মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মিজানুর রহমান মিজান এমপি শোকাহত পরিবারের পাশে গিয়ে হত্যাকারীদের কঠোর শাস্তি হবে বলে আশ্বস্ত করেন। তিনি বলেন, “হত্যাকারীরা চিহ্নিত হয়েছে। কয়েকজনকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। অবিলম্বে এ ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত সকলকে গ্রেফতার করে আইনানুগ কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করবে প্রশাসন, সেটাই প্রত্যাশা করি।” গতকাল দুপুর ১টা থেকে প্রায় এক ঘন্টা নিহতের পরিবারের পাশে অবস্থানকালীন সময়ে পাবলিক কলেজের কাউকে না দেখে তিনি বলেন, “এটা দুঃখজনক, কলেজের কাউকে দেখছি না। অনুষ্ঠানকে ঘিরে কলেজ কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হতো। অভিভাবকদের আরো সচেতন হতে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। এ সময় খালিশপুর থানার ওসি মোঃ মোশাররফ হোসেন কলেজ অধ্যক্ষের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে কয়েকবার কল দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
হত্যার সাথে জড়িত সকলকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে আইনানুগ কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে নিহতের মায়ের কাছে কথা দিয়েছেন কেএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোঃ মাহবুব হাকিমসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
এরপর শোকাহত পরিবারের পাশে যান মহানগর বিএনপি’র সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু। তাকে দেখেও কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতের মা। সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক। রাজিন আর ফিরে আসবে না কিন্তু রাজিন হত্যাকারীদের শাস্তি যেনো খুলনায় একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। একই সাথে রাজিনের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে প্রশাসনকে।” পরে মরহুমের পিতা-মাতার সাথে কথা বলেন সিটি মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনি।
খালিশপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ মোশাররফ হোসেন বলেন, “অনুষ্ঠানস্থল ঘিরে চল্লিশজন পুলিশ নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন। তবে কলেজের নিজস্ব কোন স্বেচ্ছাসেবক নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিল না। প্রথমদিন শুধুমাত্র রেজিস্ট্রেশনকৃতরা ঢুকলেও দ্বিতীয় বা ঘটনার দিন সন্ধ্যার পর সবক’টা গেট উন্মুক্ত করে সকলকে প্রবেশ করতে দিয়েছেন কলেজ কর্তৃপক্ষ। এ সুযোগে বিপুল সংখ্যক বহিরাগত প্রবেশ করে ক্যাম্পাসে। আর চুরিকাঘাতের ঘটনাটিও ঘটেছে মঞ্চের আলো-আঁধারিতে। স্কুল ছাত্রদের জটলা দেখে প্রথমে কেউ সন্দেহেই করতে পারেনি যে এমন ঘটনা ঘটছে সেখানে। পরে যা হলো তা তো সকলেরই জানা।”
এ ব্যাপারে খুলনা পাবলিক কলেজের অধ্যক্ষ লেঃ কর্ণেল মোঃ জাহাঙ্গীর আলম সময়ের খবরকে বলেন, “অনুষ্ঠানটি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ছিল না, তবে কারো কারো সাথে দু’একজন গেস্ট আসছিল। বন্ধু-বান্ধব কিছু এসেছিল। প্রথমদিন গেমস্ আসায় আমরা খুব কড়াকড়ি করেছিলাম। গত শনিবার ২৫জন পুলিশ, ঢাকা থেকে আগত এলিটফোর্স ছিল ২৫ জন, শৃঙ্খলা কমিটিতে ছিল ৪০জন আর প্রায় চার/পাঁচশ’ স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন। অনুষ্ঠানে আসলে যেখানে গন্ডগোল হবার কথা, সে সব জায়গায় কিছুই ঘটেনি। যে পাশে অনুষ্ঠান দেখা যায় না, সে সাইডে লোকজন চলাফেরা করে না, সেখানেই ঘটনাটি ঘটেছে। সেখানে সার্চলাইট ছিল না তবে আলো ছিল। আর ঘটনাস্থলের ১৫ থেকে ২০ গজ নিকটে পুলিশ ছিল। অনুষ্ঠানের সময় আসলে কারো ওইভাবে ওদিকটাকে লক্ষ্য ছিল না। আগামীকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টায় শোক সভা, কলেজের সামনে মানববন্ধন ও মরহুমের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া মাহফিলের কর্মসূচি নিয়েছি।”
 

বার পঠিত

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ


সাড়ে ৫শ’ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩

সাড়ে ৫শ’ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩

২২ অক্টোবর, ২০১৮ ০১:২০












ব্রেকিং নিউজ


সাড়ে ৫শ’ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩

সাড়ে ৫শ’ পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার ৩

২২ অক্টোবর, ২০১৮ ০১:২০