খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২১ জুন ২০১৮ | ৭ আষাঢ় ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor
মাওলানা মুনীরুল ইসলাম ইসলাম

জান্নাত ও জান্নাতবাসী

মাওলানা মুনীরুল ইসলাম ইসলাম | প্রকাশিত ০৪ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ১৪:২৭:০০

জান্নাতের অবস্থান : পরকালীন সফল মানুষের চূড়ান্ত ও চিরস্থায়ী ঠিকানা জান্নাতের অবস্থান ঘোষণা করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “কখনও নয়, নিশ্চয় নেককার লোকদের আমলনামা থাকবে ইল্লিয়্যিনে। কিসে তোমাকে জানাবে ‘ইল্লিয়্যিন’ কী?” (সূরা মুতাফফিফিন : ১৮-১৯)। ‘ইল্লিয়্যিন’ এর পরিচয় দিয়ে মুফাসসির সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘ইল্লিয়্যিন’ অর্থ জান্নাত অথবা সপ্তম আকাশে আরশের নিচে অবস্থিত একটি স্থান। (তাফসিরে বগবী : ৪৬০/৪, তাফসিরে ইবনে কাসির : ৪৮৭/৪)। ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ইল্লিয়্যিন শব্দটি ‘উলু’ শব্দ থেকে নির্গত। যখন কোনো বস্তু উপরে অবস্থান করে, তখন তার মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং তার মহত্ত্ব বাড়তে থাকে। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা তার বড়ত্ব ও মহত্ত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, কিসে তোমাকে জানাবে ‘ইল্লিয়্যিন’ কী? (সূরা মুতাফফিফিন : ১৯)।
আল্লাহর বাণী, ‘আকাশে রয়েছে তোমাদের রিজিক ও প্রতিশ্রুত সব কিছু, (সূরা জারিয়াত : ২২)। এর তাফসিরে ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) বলেন, এখানে ‘তোমাদের রিজিক’ অর্থ বৃষ্টি আর তোমাদের যা প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে, এর অর্থ হলো জান্নাত (তাফসিরুল কোরআনুল আজিম, ২৩৬/৪)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমরা যখন আল্লাহর কাছে জান্নাত কামনা করবে, তখন জান্নাতুল ফেরদাউস কামনা করবে। কারণ, তা হলো উত্তম জান্নাত, উৎকৃষ্ট জান্নাত ও উন্নত জান্নাত। এ জান্নাতের উপর রয়েছে পরম করুণাময় আল্লাহর আরশ...। (বুখারি : ২৭৯০)।
বর্তমানে জান্নাত বিদ্যমান থাকার উপর হাদিস দ্বারা প্রমাণ হলো, কা’ব ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, মোমিনের আত্মা জান্নাতে পাখির মতো, জান্নাতের গাছের সঙ্গে কেয়ামতের দিন পর্যন্ত ঝুলতে থাকবে। তারপর যখন কেয়ামতের দিন সব মানুষকে আবার জীবন দান করা হবে, তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের রুহকে তাদের দেহে আবার ফেরত দেবেন। (মুসনাদে আহমদ : ৪৫৫/৩, নাসাঈ : ২০৭৩)। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) এর বর্ণিত হাদিসে শহীদদের আলোচনায় রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, শহীদদের রুহসমূহ হুলুদ পাখির পেটের মধ্যে, তাদের জন্য রয়েছে আরশের সঙ্গে ঝুলানো প্রজ্ব¡লিত বাতি, তারা তাদের ইচ্ছামতো যেখানে সেখানে ভ্রমণ করতে থাকে, তারপর তারা আবার ওইসব বাতির কাছে চলে আসে। (মুসলিম : ১৮৮৭)।
জান্নাতের অস্তিত্ব : জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব সম্পর্কে কোরআন-হাদিসে অনেক প্রমাণ রয়েছে। মিরাজের ঘটনায় হজরত আনাস (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, ‘...তারপর জিবরাঈল (আ.) আমাকে নিয়ে চলতে থাকে। সিদরাতুল মুনতাহা পর্যন্ত পৌঁছলে তাকে কিছু রঙ এসে ঢেকে ফেলে। আমি বুঝতে পারিনি এটি কী? তারপর আমি জান্নাতে প্রবেশ করলাম। জান্নাতে আমি দেখতে পেলাম মণিমুক্তার গম্বুজ। আরও দেখতে পেলাম, জান্নাতের মাটি হলো মেশক।’ (বুখারি : ৩৩৪২, মুসলিম : ১৬২)। এ হাদিসটি আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের পক্ষে প্রমাণস্বরূপ। তারা বলেন, জান্নাত ও জাহান্নাম মাখলুক তথা আল্লাহর সৃষ্টি এবং জান্নাত আসমানে অবস্থিত।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করার পর জিবরাঈল (আ.) কে জান্নাতে পাঠান এবং বলেন, তুমি জান্নাতের দিকে তাকাও এবং দেখ আমি জান্নাতে জান্নাতিদের জন্য কী কী তৈরি করে রেখেছি। তারপর তিনি জান্নাতে প্রবেশ করেন এবং আল্লাহ তায়ালা জান্নাতিদের জন্য কী কী তৈরি করে রেখেছেন তা দেখেন। তারপর আল্লাহ তায়ালা বলেন, তুমি এখন জাহান্নামে প্রবেশ করো। আল্লাহর কথায় তিনি জাহান্নামে প্রবেশ করলেন, আল্লাহ বললেন, দেখ আমি জাহান্নামিদের জন্য কী কী তৈরি করে রেখেছি। তারপর তিনি জাহান্নামের দিকে তাকিয়ে দেখেন, জাহান্নামের এক অংশ অপর অংশের উপর দাপাদাপি করছে। (তিরমিজি : ২৫৬০, নাসাঈ : ৩৭৭২)।
ইমাম তাহাবি (রহ.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, জান্নাত ও জাহান্নাম আল্লাহর মাখলুক, কখনও তা ধ্বংস হবে না এবং ক্ষয় হবে না। কারণ, আল্লাহ মাখলুককে সৃষ্টির পূর্বে জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করেন। আর জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টির জন্য তিনি মাখলুক থেকে অধিবাসী সৃষ্টি করেন। যাদের তিনি জান্নাত দেবেন তা হবে তার পক্ষ থেকে তাদের প্রতি অনুগ্রহ। আর যাদের তিনি জাহান্নামে দেবেন তা হবে তার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে ইনসাফ। প্রত্যেকেই তার সুবিধা অনুযায়ী আমল করবে এবং তাকে যে জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সে দিকে ধাবিত হবে। আর ভালো ও মন্দ বান্দার ওপর নির্ধারিত। (আকিদাতুত তহাবি, পৃষ্ঠা ১২)। সুতরাং মহান আল্লাহর সৃষ্টি জান্নাত ও জাহান্নামের অস্তিত্ব সম্পর্কে সংশয় পোষণ করার কোনো সুযোগই নেই।
জান্নাতের আরাম-আয়েশ : আরবি ‘জান্নাত’ অর্থ ঘন সন্নিবেশিত বাগান। আরবিতে বাগানকে ‘রওজা’ এবং ‘হাদিকা’ও বলা হয়। কিন্তু জান্নাত শব্দটি আল্লাহ তায়ালার নিজস্ব একটি পরিভাষা। পারিভাষিক অর্থে জান্নাত বলতে এমন স্থানকে বোঝায়, যা আল্লাহ তায়ালা তাঁর অনুগত বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছেন, যা দিগন্ত বিস্তৃত নানারকম ফুলেফলে সুশোভিত সুরম্য অট্টালিকা সংবলিত মনোমুগ্ধকর বাগান,  যার পাশ দিয়ে প্রবহমান বিভিন্ন ধরনের নদীনালা ও ঝর্ণাধারা। যেখানে চির বসন্ত বিরাজমান।
জান্নাত চিরশান্তির জায়গা। সেখানে আরাম-আয়েশ, সুখ-শান্তি, আমোদ-প্রমোদ, চিত্তবিনোদন ও আনন্দ-আহ্লাদের চরম ও পরম ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে রয়েছে ভোগবিলাস ও পানাহারের আতিশয্য। জান্নাতিরা যা কামনা করবে এর সবকিছুই পাবে। সেখানে সবাই যুবক হয়ে বাস করবে। শরীরে কোনো রোগশোক, জরাজীর্ণতা, মন্দা, বার্ধক্য, দুর্বলতা ও অপারগতা থাকবে না। যত ধরনের ফলফলাদি, খাদ্য-খাবার, পানীয়, দুধ, মধু, সুস্বাদু খাবার সব খেতে পারবে। ভোগবিলাসের সব উপায়-উপকরণ সেখানে বিদ্যমান। সেগুলো স্বাদ ও গন্ধে অপূর্ব। আমোদ-প্রমোদ, ভ্রমণবিহার, খেলাধুলা, বেড়ানো, বাজার করা ও শুভেচ্ছা-স্বাগত জানাতে পারবে। প্রাচুর্যের কোনো অভাব হবে না। মনের ইচ্ছা চোখের নিমেষে পূরণ করতে পারবে।
নারীদের জন্য থাকবে নয়নাভিরাম স্বামী এবং স্বামীদের জন্য থাকবে নয়নাভিরাম স্ত্রী ও রূপবতী লাবণ্যময়ী হুর। তারা সেখানে সুখী-সুন্দর দাম্পত্য জীবনযাপন করবে। মানুষ সেখানে পেশাব-পায়খানা, নাকের শ্লেষ্মা থেকে মুক্ত এবং নারীরা ঋতুমুক্ত হবে। এক কথায় পরম ও চরম শান্তি বলতে যা বোঝায়, তার সবই জান্নাতে পাওয়া যাবে। দুনিয়ার সুখ-শান্তির যত ব্যবস্থা আছে, জান্নাতের সুখ-শান্তির তুলনায় তা কিছুই নয়। তা দুনিয়ার সব আরাম-আয়েশকে হার মানাবে।
জান্নাতের ব্যাপক পরিচিতি সম্পর্কে সংক্ষেপে মহান আল্লাহ বলেন, ‘কেউ জানে না তার জন্য কৃতকর্মের কী কী নয়নাভিরাম বিনিময় লুকায়িত আছে।’ (সূরা সাজদাহ : ১৭)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘আমি আমার নেক বান্দাদের জন্য এমন নেয়ামত তৈরি করে রেখেছি, যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এমনকি কোনো মানুষ তা কল্পনাও করতে পারে না। এরপর তিনি বলেন, যদি তোমরা চাও, তাহলে নিম্নোক্ত আয়াতটি পড়ো। যার অর্থ হলো, ‘কেউ জানে না, তার জন্য কী কী নয়নাভিরাম বিনিময় লুকায়িত আছে।’ (বুখারি : ৩২৪৪; মুসলিম : ২৮২৪)।
জান্নাতে যাওয়ার পথ : আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করে আল্লাহ তাকে প্রবেশ করাবেন জান্নাতগুলোতে, যার তলদেশে প্রবাহিত রয়েছে নহরসমূহ। সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর এটা মহা সফলতা।’ (সূরা নিসা : ১৩)। জান্নাতে যাওয়ার পথ ও পাথেয় হচ্ছে, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করা, কোরআন-হাদিসের জ্ঞান অর্জন করা, নিজের মধ্যে ঈমান বদ্ধমূল করা এবং নেক আমল করা। নেক আমলগুলো হচ্ছে, ঈমান ও ইসলামের রুকনসমূহ পরিপূর্ণভাবে আদায় করা, সুন্দর চরিত্র, আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখা, গরিব-মিসকিনদের জন্য ব্যয় করা, মেহমানদারি করা ইত্যাদি। জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার প্রধান মাধ্যমসমূহ হচ্ছে, মাতাপিতার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করা, আল্লাহর জিকির করা, সালামের প্রসার করা, অসহায় ও গরিব লোকদের প্রতি দয়া করা, দ্বীনের ব্যাপারে মানুষকে সহযোগিতা করা।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহর নৈকট্য অর্জন কর এবং আমলসমূহকে সুন্দর কর, আর মনে রাখবে তোমাদের কেউ তার আমল দ্বারা জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে না। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করল, আপনিও কি নাজাত পাবেন না হে আল্লাহর রাসুল! রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, না, আমিও না, তবে যদি আল্লাহ তাঁর রহমত ও দয়া দ্বারা আমাকে ঢেকে ফেলেন তাহলে আমি নাজাত পাব।

 

বার পঠিত

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন






ব্রেকিং নিউজ





এবার যশোরে ব্রাজিল বাড়ি 

এবার যশোরে ব্রাজিল বাড়ি 

২১ জুন, ২০১৮ ০১:০৯

বিশ্বকাপে আজকের খেলা 

বিশ্বকাপে আজকের খেলা 

২১ জুন, ২০১৮ ০১:১৩