খুলনা | শনিবার | ২১ এপ্রিল ২০১৮ | ৮ বৈশাখ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

দেশে গরীবরা আরও গরীব হচ্ছে ধনীরা আরও ধনী : সিপিডি

খবর প্রতিবেদন | প্রকাশিত ১৪ জানুয়ারী, ২০১৮ ০১:১০:০০

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বেড়ে চললেও ধনী-গরীব বৈষম্য কমেনি বলে পর্যবেক্ষণ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, প্রবৃদ্ধির ‘গুণগত মানের অভাবে’ ধনী-গরিবের সম্পদ বৈষম্য আরও বেড়েছে। কমেছে দারিদ্র্য হ্রাসের হার। ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্যর উর্দ্ধগতি, ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ কমে যাওয়া, রপ্তানির থেকে আমদানি বৃদ্ধি পাওয়াসহ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থতিশীলতা চাপের মধ্যে রেখে পার করলো ২০১৭। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে চলতি বছরে অর্থনীতি আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সরকারের চার বছরে উপলক্ষে বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং অর্থনীতির পর্যালোচনা তুলে ধরে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সরকারের চার বছর শেষে সিপিডির উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক মূল্যায়নে উঠে এসেছে অর্থমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুর্বলতা। 
সংস্থাটির পর্যালোচনা বলা হয়েছে, গেল বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি যে হারে বৃদ্ধি পেয়েছেÑসে অনুপাতে দারিদ্রের হার কমেনি বরং হত দরিদ্র আরো বেশি দরিদ্র হয়েছে আর সবচেয়ে ধনী আরও সম্পদশালী হয়েছে। এর পেছনের কারণ হিসেবে সামগ্রিক অর্থনীতির সঠিক অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করা হয়েছে। আরো বলা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতের পাশাপাশি সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প শেষ না করেই বন্ধ করে দেয়া-প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি করাতেও অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় উল্লেখযোগ্য।
এদিকে, মূল্যস্ফিতি বেড়েছে, রপ্তানি কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে, বেড়েছে আমদানি। বিদেশে কর্মী পাঠানোর হার স্থিতিশীল থাকলেও অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়নি কমেছে ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগও। আর বর্তমান ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি, অপরিশোধিত ঋণের হার অব্যাহত থাকলে ২০১৮ সালে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি হবে। এ বছরকে নির্বাচনী বছর উল্লেখ করে অর্থনীতির গতি ঠিক রাখতে কিছু সুপারিশ তুলে ধরেছে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি। একই সঙ্গে অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা অর্থমন্ত্রণালয়ের দুর্বলতা কাটানোর সুপারিশও করা হয়। 
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে মানুষের আয়ের বৈষম্য বেড়েছে। ২০১৬ সালে দেশের মানুষের মোট আয়ের ০.২৩ শতাংশ আসে সবচেয়ে দরিদ্রদের পাঁচ ভাগ থেকে, যা ২০১০ সালে ছিল ০.৭৪ শতাংশ। অন্যদিকে ২০১৬ সালে মোট আয়ে সবচেয়ে ধনী পাঁচ শতাংশের অবদান ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ ছিল বলে সিপিডির হিসাব।অর্থাৎ ধনীরা ২০১০ সালে যা আয় করতেন, ২০১৬ সালে এসে এরচেয়ে বেশি আয় করছেন, অন্য দিকে আয় কমেছে গরীবদের। সিপিডির হিসাবে, সবচেয়ে দরিদ্র পাঁচ শতাংশের খানা প্রতি আয় (হাউজহোল্ড ইনকাম) ২০০৫ সালে ছিল ১১০৯ টাকা, যা কমে ২০১৬ সালে ৭৩৩ টাকায় দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে ধনী পাঁচ শতাংশের খানা প্রতি আয় ৩৮ হাজার ৭৯৫ থেকে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে হয়েছে ৮৮ হাজার ৯৪১ টাকা। ২০১০ সালে দেশের মোট সম্পদের ৫১ দশমিক ৩২ ভাগ ছিল সর্বোচ্চ ধনী পাঁচ শতাংশের কাছে, অন্যদিকে ০.০৪ ভাগ ছিল সবচেয়ে দরিদ্র পাঁচ ভাগের কাছে।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কাছে প্রবৃদ্ধির সুফল পৌঁছায়নি। গরীবরা আরও গরিব হচ্ছে, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে।” সামষ্টিক অর্থনীতির অগ্রযাত্রার মধ্যে এই বৈষম্য বাড়ার জন্য ‘প্রবৃদ্ধির গুণগতমানের অভাবকে’ দায়ী করেন সিপিডির ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য্য। 
তিনি বলেন, বাংলাদেশ গত এক দশক ধরে একটি শোভন প্রবৃদ্ধির হার রক্ষা করতে পেরেছে।কিন্তু এই শোভন প্রবৃদ্ধির হারের নিচে যে অন্ধকারটি রয়েছে সেটি হল দেশের ভেতরে সে তুলনায় কর্মসংস্থান না হচ্ছে না, দারিদ্র্য বিমোচনের হার শ্লথ হয়েছে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই বৈষম্য শুধু আয়ে আর ভোগে বৃদ্ধি পায়নি, সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে সম্পদের বৈষম্য। এর কারণ হিসেবে ব্যাংকে ঋণের টাকা ফেরত না দেওয়া, বড় বড় প্রকল্পের ভেতর থেকে বিভিন্ন ধরনের ঠিকাদারি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থ ভিন্ন দিকে পরিচালনা করাকে চিহ্নিত করেন তিনি।
 দেবপ্রিয় বলেন, আমরা যতখানি না প্রবৃদ্ধির পরিমাণ নিয়ে চিন্তিত থাকতাম, এখন সময় হয়েছে সেই প্রবৃদ্ধির গুণগত মান নিয়ে চিন্তা করার। প্রবৃদ্ধি যে পরিমাণ মানুষকে উপরে তোলার কথা সে পরিমাণ তুলতে পারছে না। তিনি জানান, ২০০০ থেকে ২০০৫ সালে দারিদ্র্য হ্রাসের হার ছিল ১ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০১০ থেকে ২০১৬ সালে নেমে হয়েছে ১ দশমিক ২ শতাংশ। কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৩ থেকে কমে হয়েছে ১ দশমিক ৯ শতাংশ। 
অর্থনৈতিক বৈষম্য ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা দেবপ্রিয়র। তিনি বলেন, আমাদের বিশ্লেষণ বলে, যদি একটি দেশের ভেতরে ক্রমান্বয়ে আয়ের বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, তাহলে তা প্রবৃদ্ধির হারের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে অর্থাৎ যত বেশি বৈষম্য দেশে আছে সে দেশে প্রবৃদ্ধির হার উপরের দিকে নেওয়া তত বেশি সমস্যা। সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন ও ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান উপস্থিও ছিলেন।
 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ