খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | ২৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

১১টি বইয়ের হদিস মেলেনি : ফের আগের দু’অর্থ বছরের তদন্ত শুরু

কেসিসি’র লাইসেন্স শাখায় শুধু ২০১৬-১৭ অর্থ বছরেই প্রায় ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ!

এস এম আমিনুল ইসলাম | প্রকাশিত ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০২:০০:০০

খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি)’র লাইসেন্স শাখায় কর্মরত পরিদর্শকরা শুধুমাত্র ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে ২৪ লাখ ২৫ হাজার ১৫৮ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন ও ইস্যু করে আদায়কৃত অর্থ তহবিলে জমা না করে এসব টাকা তারা আত্মসাৎ করেছেন। সম্প্রতি ওই শাখায় ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে এমন অভিযোগের প্রেক্ষিতে গঠিত ৩ সদস্যের অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গত বৃহস্পতিবার একটি তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করেছেন। ওই রিপোর্টে এসব তথ্য উঠেছে এসেছে। তদন্তে দায়ী ব্যক্তিদের নিকট থেকে আত্মসাৎকৃত টাকা আদায়সহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে কমিটি। তবে হদিস না মেলেনি বাকী ১১টি লাইসেন্স বই। অডিট কমিটির কাছেও জমা পড়েনি। ফলে ওইসব বইগুলো অডিটের আওতার বাইরে রয়েছে গেছে।
অপরদিকে ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের অনিয়ম, দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে সংস্থার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল হালিমকে আহ্বায়ক করে ফের ৩ সদস্য বিশিষ্ট আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু ওই কমিটির কাছে লাইসেন্স শাখার সকল নথিপত্র জমা প্রদানের কথা থাকলেও গত রবিবার শেষ দিনে একটি নথিও জমা পড়েনি। এই দুই অর্থবছরের নথিপত্র অডিট করা গেলে আসল থলের বিড়াল বের হয়ে আসবে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর এমন প্রত্যশা। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কেসিসি’র ৩১টি ওয়ার্ডের রাজস্ব আদায়ের সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে এমন সব শাখাগুলো অডিটের উদ্যোগ নেয় সংস্থার একটি অভ্যন্তরীণ কমিটি। তিন সদস্যের কমিটিতে অডিট অফিসার মুহাম্মদ ইমরান হোসেন তুহিনকে আহ্বায়ক, হিসাবরক্ষক রওশন আরা খাতুনকে এবং সহকারী হিসেব রক্ষক শেখ তুষারাত সদস্য করা হয়। ওই অডিট কমিটি প্রথমেই সংস্থার লাইসেন্স শাখার কার্যক্রম শুরু করে। এ কার্যক্রমের আওতায় লাইসেন্স শাখার কাছে অডিট কমিটি মুড়ি বইসহ আনুষাঙ্গিক কাগজপত্র তলব করে। কিন্তু উক্ত শাখা ২০৪টি বই-এর মধ্যে ১৯৩টি এম বই অডিট টিমের কাছে হস্তান্তর করে। সরবরাহকৃত এই ১৯৩টি বই যাচাই-বাছাই করে কমিটি দেখেছেন ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মোট ৪ কোটি ৬২ লাখ ৫৩ হাজার ৮১ টাকা আদায় করে পরিদর্শকরা। কিন্তু উক্ত টাকার মধ্যে ২৪ লাখ ২৫ হাজার ১৫৮ টাকা কর্পোরেশনের তহবিলে জমা প্রদান না করে তারা আত্মসাৎ করেছেন। এর মধ্যে পরিদর্শক হাবিবুর রহমান ২৩ লাখ ৭ হাজার ৭৮ টাকা, মোঃ হুমায়ুন কবীর ২৪ হাজার ৪৫০ টাকা, শফিকুল ৯ হাজার ১শ’ টাকা, খান শফিকুল ৩ হাজার ১৫০ টাকা, মোহাম্মদ আলী ২৯ হাজার ২শ’ টাকা ও মঞ্জু ৪ হাজার ৬৮০ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। পাশাপাশি তদারকি ও ক্যাশিয়ারের দায়িত্বে অবহেলার কারণে এ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে বলে অডিটে প্রতিয়মান হয়েছে। তাই তদন্তে দায়ী ব্যক্তিদের নিকট থেকে আত্মসাৎকৃত টাকায় আদায়সহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করেছে ওই কমিটি।
এদিকে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন প্রদানে জাল বই ব্যবহার করা হয়েছে। এমন একটি ঘটনায় গত জুলাই মাসে নগরীর খালিশপুরের একটি আটার মিলে জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান চালায়। অভিযানে নাজমুল ট্রেডার্স নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে একই নম্বরের দু’টি জাল লাইসেন্স পাওয়া যায়। যা নিয়ে খালিশপুর থানার এক এসআই সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা করেন। বিষয়টি এনএসআই তদন্ত করছে। অনেক সময় মুড়ি বইয়ের ভেতরের পাতাগুলোর সাথে যোগফলের টাকার চরম গড়মিলভাবে কম অর্থ জমা প্রদান করা হয়েছে। কর্পোরেশনের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে এ ধরনের একটি দুর্নীতির মুড়ি বই জব্দ রয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরের লাইসেন্স শাখার সকল ডাটা কম্পিউটারে এন্ট্রি, টাকা ব্যাংকে জামা, লাইসেন্স প্রদানে বই তৈরি হওয়াতে পরিদর্শকরা তাদের হাত খাতায় আগের বকেয়া ফ্রুট দিয়ে ঘষা-মাঝা করে পরিশোধ করেছেন। পাশাপাশি পূর্বের অর্থবছরের নবায়ন বিল পরিশোধ না দেখিয়ে চলতি অর্থ বছরের লাইসেন্স হালনাগাদ করেছেন। লাইসেন্স শাখার অনেক নথিপত্র আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আর এসব দুর্নীতির মাধ্যমে পরিদর্শকরা কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আত্মসাৎ করছেন। এসব দুর্নীতি আড়াল করেতে বাকী ১১টি বই বারবার তাগিদ দেয়া সত্ত্বেও পরিদর্শকরা অডিট কমিটির কাছে জমা প্রদান থেকে বিরত রেখেছেন। প্রতিটি মুড়ি বইতে রয়েছে অন্তত ১শ’টি লাইসেন্স রয়েছে। ১১টি মুড়ি বইতে অন্তত ১১শ’ লাইসেন্স রয়েছে। ফলে মোটা অঙ্কের রাজস্ব হারিয়েছে কর্পোরেশন। পাশাপাশি এর সাথে জড়িত পরিদর্শকরা তদন্তের বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
অপরদিকে ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের অনিয়ম, দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে সংস্থার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল হালিমকে আহ্বায়ক করে ফের ৩ সদস্য বিশিষ্ট আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অডিট অফিসার মুহাম্মদ ইমরান হোসেন তুহিন ও রাজস্ব কর্মকর্তা মোঃ অহিদুজ্জামান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, দুর্নীতির টাকা হজম করতে পরিদর্শকরা ১১টি বই নিখোঁজ করে দিয়েছে। ওই বইগুলোর ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ অর্থ বছরের অনিয়ম, দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে হবে। তাহলে থলের বিড়াল বের হয়ে আসবে। অন্যথায় কর্পোরেশনের ওই শাখার অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধ করা সম্ভব না।
অবশ্য দোষী দের কী ধরনের শাস্তি দেয়া হবে সে ব্যাপারে কর্পোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা পলাশ কান্তি বালা কোন মন্তব্য করেননি। তিনি বলেছেন মেয়রের সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কর্পোরেশনের সচিব মোঃ ইকবাল হোসেন বলেন, তদন্ত রিপোর্ট জমা হয়েছে। দেখে-বুঝে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অর্থ সংস্থাপন ও স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ও ২০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর শেখ মোঃ গাউসুল আযম বলেন, এ তদন্তের ব্যাপারে অর্থ সংস্থাপন ও স্থায়ী কমিটিকে কিছুই জানানো হয়নি। ফলে এ ব্যাপারে মন্তব্য করা সম্ভব না।

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০১:০০