খুলনা | সোমবার | ২২ জানুয়ারী ২০১৮ | ৯ মাঘ ১৪২৪ |

শিরোনাম :

Shomoyer Khobor

‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’

যেখানে ৭১ কথা বলে

আ ব্দু ল্লা হ এ ম রু বে ল | প্রকাশিত ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:২৬:০০

খুলনার প্লটিনাম জুবিলি জুট মিলের বয়লারের এক অংশ। ১৯৭১ সালে নাৎসি কায়দায় এই বয়লারে বাঙালিদের পুড়িয়ে মারতো পাকিস্তানী সেনা ও তার দোসররা। শুধু এই নিদর্শন নয় এমনই বহু নির্দশন রয়েছে নগরীর ২৬ সাউথ সেন্ট্রাল রোডে ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরটিতে। এসব  নিদর্শনের সামনে এসে দর্শনার্থীরা ফিরে যান ১৯৭১-এর যুদ্ধের দিনগুলিতে। আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন তারা। তাদের  চোখে ভেসে ওঠে মহান মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত বাঙালীদের করুণ দৃশ্য, মু্িক্তপাগল বাঙালীদের আত্মত্যাগ। পাক হানাদারদের বিভৎসতা জানতে পেরে আঁতকে ওঠেন অনেকে।  
স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা, ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে আর ওই সময়ের গণহত্যা ও নির্যাতনের সঠিক তথ্য তুলে আনার লক্ষেই গণহত্যা নির্যাতন আর্কাইভ ও যাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধ আর গণহত্যার ইতিহাস নিয়ে কখনও কখনও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়। এসব বিভ্রান্তি দূর করতে, ইতিহাস বিকৃতি ঠেকাতে আর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতেই ইতিহাসবিদ ড. মুনতাসির মামুন তার নিজ আগ্রহে আর উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছে ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও যাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধের সময় খুলনা অঞ্চলে গণহত্যা বেশী হওয়ায় এই যাদুঘরটি এই অঞ্চলেই প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ১৭ মে খুলনা মহানগরীর ময়লাপোতা এলাকায় শেরে বাংলা রোডে একটি ভাড়া বাসায় এই জাদুঘরের যাত্রা শুরু হয়। ২০১৫ সালের আগস্টে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে নগরীর ২৬ সাউথ সেন্ট্রাল রোডের দ্বিতল বাড়ি উপহার পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সেটি সংস্কার করে ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ সেখানে স্থানান্তর হয় আর্কাইভ ও জাদুঘরটি।
এখানে রয়েছে ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধু’র ভাষণের আলোকচিত্র, ২৫ মার্চ বাঙালি জাতির ওপর পাকিস্তানীদের নির্মম নির্যাতন, ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মুহুর্ত, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বিভিন্ন গণহত্যার দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের তোলা আলোচিত। মোট ৯টি গ্যালারিতে এসব আলোকচিত্র ছাড়াও স্থান পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন যুদ্ধে ব্যবহৃত ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত পোশাকসহ আরও অনেক কিছু। এরমধ্যে নীচ তলায় ১ নম্বর গ্যালারিতেই চোখ পড়বে একটি কালো টেলিফোন সেট। টেলিফোন সেটটি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজরিত। খুলনার খানজাহান আলী রোডে মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন কবীরের বাড়ি ‘কবির মঞ্জিলে’ ছিলো বিপ্লবী কাউন্সিলের প্রধান কার্যালয়ে। এই কার্যালয়ে ৪৯২৬ নাম্বারের এই টেলিফোন সেটটিই ব্যবহৃত হতো মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজনীয় খবর, নির্দেশনা ও কৌশল আদান-প্রদানে। যাদুঘরে শহীদ গ্যালারি নামে একটি গ্যালারি আছে। এটিতে শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ব্যবহৃত একটি শাড়ী আছে। এই শাড়ীটি পরা অবস্থায় তার লাশ পাওয়া যায়। শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনির চৌধুরীর ব্যবহৃত পাঞ্জাবী। এছাড়াও রয়েছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহৃত টাই, কলমও রয়েছে। শহীদ পরিবারের সদস্যরা এগুলো জাদুঘরকে দান করেছেন।
জাদুঘরে এসে এসব নিদর্শন দেখে দর্শনার্থীরা আবেগ প্রবণ হয়ে পড়েন। কথা হয় মফিদুল ইসলাম নামে এক দর্শনার্থীর সাথে। তিনি বলেন এখানে এসে  যেন মনে হচ্ছে ৭১ সালের মধ্যে রয়েছি। মহান মুক্তিযুদ্ধের অজানা অনেক ঘটনায় এখানে স্বাক্ষী হিসেবে রয়েছে। যা আমাদেরকে আবেগ আপ্লুত করে।’
গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরের রের সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা যায়, তদের কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে, গণহত্যার বিস্মৃত স্থানগুলো যেমন বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিতকরণ, গণহত্যা-নির্যাতন নিয়ে অনলাইন ও অফলাইন আর্কাইভ গড়ে তোলা, শিশু-কিশোরদের জন্য নিয়মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রদর্শনীর আয়োজন করা। প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নিয়ে গণহত্যা-নির্যাতন নির্ঘন্ট ও শহীদ স্মৃতি গ্রন্থ প্রকাশ করা। গণহত্যা-নির্যাতন নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার এবং শহীদ স্মৃতি বক্তৃতার আয়োজন করা। সারাদেশে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের গবেষক তৈরি করা। নতুন প্রজন্মের জন্য ইয়থ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা। একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে এ্যাডভোকেসি করা। গণহত্যার বিস্মৃত স্থানগুলো চিহ্নিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন বধ্যভূমিতে ফলক নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে জাদুঘর। এরই মধ্যে খুলনা জেলার ২০টি গণহত্যাস্থল বা বধ্যভূমিতে স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে। জাদুঘরের লাইব্রেরিতে রয়েছে এক হাজারেরও বেশী বই। যেগুলো সবই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই। জাদুঘরের নিজস্ব প্রকাশনার বই রয়েছে পঞ্চশটি। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ের বিভিন্ন আলোকচিত্র, অডিও-ভিডিও ক্লিপ, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদপত্র।
গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও যাদুঘরের ৫০ সদস্য রয়েছে, তাদের মধ্যে একজন সক্রিয় সদস্য আবু তাহের প্রিন্স। এ প্রতিবেদককে তিনি বলেন, আমাদের মুক্তিযোদ্ধা হারানো ও গণহত্যায় নির্যাতনের ইতিহাসটা নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরাই আমাদের সুহৃদ সদস্যদের মুল উদ্দেশ্য। এজন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তবে জাদুঘরের পরিপূর্ণতার জন্য খুলনা অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির নেতৃত্বে যারা আছেন, তাদেরকেও আরও অগ্রনী ভূমিকা পালন করতে হবে।  
এদিকে জাদুঘরে আরও দর্শনার্থী বৃদ্ধি এবং তরুণ প্রজন্মকে যুক্ত করতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কথা হয় গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও যাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সাধারণ সম্পাদক ডাঃ বাহারুল আলম’র সাথে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সরকারি প্রচার মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্ব না দেওয়ায় মানুষ তেমন কিছু জানতে পারছেননা। এছাড়া সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক সহায়তাও দেয়া হয়না। যে কারণে জাদুঘরটির আধুনিকায়ন এবং সারাদেশে চিহ্নিত ১ হাজার গণহত্যাস্থল সংরক্ষণের পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন হচ্ছেনা।’ তবে তিনি জানান, দর্শনার্থী বাড়ানো ও  তরুন প্রজন্মকে এর সাথে যুক্ত করতে কাজ করে যাচ্ছেন তারা। এছাড়াও ৫০ জন সুহৃদ সদস্য রয়েছেন এই জাদুঘরে। এসব সুহৃদ সদস্যরাই জাদুঘরের কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে মাসে দুবার সভাও করেন। সুহৃদ সদস্যরা বিভিন্ন স্কুলের শিক্ষার্থীদের এখানে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। যাচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

একাত্তরের খুলনা বিজয়

একাত্তরের খুলনা বিজয়

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:২২



পারুলিয়ায় গণহত্যা- ১৯৭১

পারুলিয়ায় গণহত্যা- ১৯৭১

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:২১



যুদ্ধকালীন স্মৃতি

যুদ্ধকালীন স্মৃতি

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:১৭

ছবি আঁকায় পরাণ জুড়ায়

ছবি আঁকায় পরাণ জুড়ায়

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:১৫

বিজয়ের অর্জন প্রশ্ন পাশাপাশি

বিজয়ের অর্জন প্রশ্ন পাশাপাশি

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:১৪

শহীদ পরিবার থেকে বলছি

শহীদ পরিবার থেকে বলছি

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:১৫




ব্রেকিং নিউজ