খুলনা | রবিবার | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

একাত্তরের খুলনা বিজয়

কা জী মো তা হা র র হ মা ন | প্রকাশিত ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:২২:০০

একাত্তোরের ডিসেম্বরে প্রথম দিনে দেশের অধিকাংশ থানা ও মহাকুমা শহর পাকিস্তানি বাহিনীর হাতছাড়া হয়। ভারত সীমান্তের কাছে যশোর সেনানিবাস পাকিস্তান বাহিনীর দুর্ভেদ্য ঘাটি। এ সেনানিবাস বৃটিশ আমলের। যশোর সেনানিবাস নিয়ে অনেক আশা ভরসা লেঃ জেঃ নিয়াজীর। ৬ ডিসেম্বর মাঝ রাতে যশোর সেনানিবাসে পাকিস্তান বাহিনীর গোলাগুলি থেমে যায়। সেনানিবাস থেকে অস্ত্র গোলাবারুদ নিয়ে নিয়াজীর সেনারা পালিয়ে যায়। ৭ ডিসেম্বর যশোর শহরে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ে। ১১ ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকারের নির্দেশে যশোর জেলা প্রশাসনের কাজ শুরু হয়। ৯ ডিসেম্বর নওয়াপাড়া থেকে পিছু হোটে পাকিস্তানী সেনারা শিরোমনি এসে ঘাটি স্থাপন করে। রাস্তার ওপর ট্যাংক বিধ্বংসী মাইন পুঁতে নিজেদের বুহ্যকে সুরক্ষিত করে তোলে খুলনা শহরের পশ্চিমপ্রান্ত শিরোমনিকে তারা নিরাপদ স্থান বেছে নেয়। পাকিস্তান বাহিনী শিরোমনি, আটরা, গিলাতলা, মশিয়ালি, তেলিগাতি, মিরেরডাঙ্গা, ফুলবাড়িগেটসহ আশেপাশের এলাকাকে নিয়ে মজবুত ঘাটি স্থাপন করে। গোটা এলাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী স্থানীয়দের ওপর নির্যাতন চালায় ও তাদের সম্পদ লুটে নেয়। ব্রিগ্রেডিয়ার হায়াত খানের নেতৃত্বে যশোর, খুলনা ও সাতক্ষীরার সকল পাকিস্তানি বাহিনী শিরোমনিতে এসে অবস্থান নেয়। পাকিস্তানি জেনারেল এর উদ্দেশ্য ছিলো মংলা বন্দর দিয়ে জাহাজ যোগে স্বদেশে পালিয়ে যাবে। এখান থেকে তারা কোন রকম এ চালনা বন্দরে পৌঁছাতে পারলেই সপ্তম নৌ-বহর। সপ্তম নৌ বহর ছিলো চালনা বন্দরের বর্হিঃনোঙ্গরে। ভারত সীমান্তের কাছে হওয়ায়  ব্রিগেডিয়ার হায়াত খানের নেতৃত্বে ছিল পাকিস্তানের বৃহত্তম ট্যাংক বহর ও আর্টিলারি ডিভিশন। পাকিস্তান বাহিনীকে আক্রমণ করার জন্য ৮ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর মঞ্জুর ও ৯ সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল যৌথ ভাবে অংশ নেয়। তাদের সাথে মিত্র বাহিনীর মেজর জেনারেল দলবীর সিং। শিরোমনিতে ১০ ডিসেম্বর থেকে থেকে যুদ্ধ শুরু হয় এবং তা চলে ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত।  মিত্র বাহিনীর মেজর জেনারেল দলবীর সিং ১০ ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনীর অবস্থান বুঝতে না পেরে পুরাতন ট্যাংক নিয়ে শত্র“র বুহ্যের মধ্যে ঢুকে পড়ে। এতে বেশ কয়েকজন ভারতীয় সেনা নিহত হয়। তারপর তিনি অষ্টম সেক্টর কমান্ডার মেজর মঞ্জর ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দেন। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পনের খবর ইথারে ইথারে ছড়িয়ে পড়ে। মেজর মঞ্জুর লুঙ্গী পড়ে শ্রমিকের বেশ ধারণ করে দুহাতে দু’টি স্টেনগান নিয়ে পাক বাহিনীর ট্যাংক বহরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। তিনি ট্যাংকের ভেতরে গণ্যম্যানদের খুঁজে খুঁজে গুলি করে হত্যা করে। স্তব্ধ হয়ে যায় পাকিস্তানীদের ট্যাংক বহর। এ খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তান বাহিনী স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান আজকের বাংলাদেশ ব্যাংক এবং টেলিফোন বিভাগের সুউচ্চ টাওয়ার এক্সক্লুসিভ দিয়ে উড়িয়ে দেয়। শিরোমনি যুদ্ধ জয় শেষে মিত্র ও মুক্তি বাহিনী নিউজপ্রিন্টে অবস্থানরত পাক বাহিনীর স্থানীয় কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার হায়াত খানের দপ্তরে হাজির হয়। হায়াত খান আত্মসমর্পনে রাজি হয়। সেখান থেকে তিনি সার্কিট হাউজে এসে উপস্থিত হন। সার্কিট হাউজে ১৭ ডিসেম্বর শুক্রবার জুম্মার নামাজের পর মিত্র বাহিনীর মেজর জেনারেল দলবীর সিং, ৮ নম্বর সেক্টর কমাণ্ডার মেজর মঞ্জুর এবং ৯ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর এমএ জলিল এর উপস্থিতিতে পাকিস্তানি সেনাকর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান বেল্ট ও ব্যাচ খুলে দিয়ে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকে। পাকিস্তানি সেনাকর্মকর্তা আত্মসমর্পনের দলিলে স্বাক্ষর করে। এ দিকে কপিলমুনি রাজাকার ক্যাম্প ধ্বংস হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধারা লঞ্চযোগে বাড়োআড়িয়া, মাইলমারা হয়ে জলমায় এসে অবস্থান নেয়। জলমা চক্রাখালি স্কুলে ক্যাম্প স্থাপন করে। এই গ্র“পের মুল নেতৃত্বে ছিলেন ৯ম সেক্টরের শেষ দিককার কমান্ডার মেজর জয়নাল আবেদীন খান। তিনি সাবসেক্টর কমান্ডার লেঃ কর্নেল এএসএস সামমুল আরেফিন, কমান্ডার খিজিরকে লায়ন্স স্কুল এলাকায় ক্যাপ্টেন সাহজাহান মাস্টারকে কুলুটি নামক স্থানে আফজাল হোসেন ও কুতুবুদ্দিনকে সাচিবুনিয়া থেকে লায়ন্স স্কুল অভিমুখে শত্র“ঘাটিতে আক্রমণের নির্দেশ দেন। ক্যাপ্টেন ফহম উদ্দিন ও লেঃ নোমান উল্লাহর দায়িত্ব ছিলো সেনের বাজার ও রাজাপুর এলাকায়। যাতে শত্র“রা এসব স্থান থেকে পালাতে না পারে। জলমা চক্রাখালি হাইস্কুল থেকে মেজর জয়নাল আবেদিন খানের নেতৃত্বে গাজী রহমাতুল্লাহ দাদু ও স ম বাবর আলীসহ অন্যান্যরা ১৬ ডিসেম্বর রাত ১২টায় গল্লামারী রেডিও সেন্টার অভিমূখে রওনা হয়। গল্লামারী রেডিও সেন্টার ও লায়ন্স স্কুলে পাকিস্তানি সেনাদের ঘাটি ছিলো। ভোর ৬টা পর্যন্ত যুদ্ধের পর গল্লামারী রেডিও সেন্টারে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পন করে। তার আগে পাকিস্তানি বাহিনী বেতার কেন্দ্রে ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন ট্রান্সমিটার ডিনামাইট দিয়ে ধ্বংস করে দেয়। গল্লামারীতে পাকিস্তান বাহিনীকে পরাজিত করার পর বিজয় উল্লাস করতে করতে মুক্তিযোদ্ধারা খুলনা সার্কিট হাউজে এসে পৌঁছ্য়া। সকাল আনুমানিক ৯টা নাগাদ মেজর জয়নাল আবেদিন খান ও গাজী রহমাতুল্লাহ দাদু সার্কিট হাউস ময়দানে বাংলদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এখবর চারিদিকে প্রচারিত হবার পর মুক্ত খুলনাবাসী জয়বাংলা শ্লোগান দিয়ে সার্কিট হাউজে এসে হাজির হয়। এর পর বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধারা শহরে প্রবেশ করতে থাকে।
(তথ্য সূত্র : স ম বাবর আলী রচিত স্বাধীনতার দুর্জয় অভিযান)

 

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বদলে যাবে মংলা বন্দর

বদলে যাবে মংলা বন্দর

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০১













ব্রেকিং নিউজ








খুলনায় বিসিবি’র চারদিনের ম্যাচ ড্র

খুলনায় বিসিবি’র চারদিনের ম্যাচ ড্র

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০১:২৩

আবারও ব্যার্থ আশরাফুল

আবারও ব্যার্থ আশরাফুল

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০১:২৩