খুলনা | মঙ্গলবার | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

একাত্তরে শিক্ষক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যকে হত্যা

গৌরাঙ্গ নন্দী | প্রকাশিত ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:২৪:০০

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে পরিকল্পিতভাবে অনেক হত্যাকান্ড ঘটেছে। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীরা, পাকিস্তান রক্ষায় শপথগ্রহণকারীরা বেছে বেছে মানুষকে হত্যা করেছে। এই হত্যাকান্ডের প্রথম শিকার হয়েছে এলাকায় জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী মানুষেরা, বিশেষত: আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ব্যক্তি বা নেতা এবং আওয়ামী লীগ অনুসারী হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা। যেহেতু প্রচারণাটি তৈরি করা হয়েছিল, মুসলমানের দেশ পাকিস্তানকে হিন্দুদের দেশ ভারত সহ্য করতে পারছে না, সে কারণে হিন্দুরা পাকিস্তান বিরোধী। ফলে হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
এই কারণে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে সেই সময়ের শাসক দল মুসলিম লীগের অনুসারী, জামায়াতে ইসলামী ও অবাঙালিরা পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে। তারাই প্রধানত: হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের বাড়ি-ঘরে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকান্ড শুরু করে। খুলনায় এরকম অনেক পরিকল্পিত হত্যাকান্ড ঘটেছে। এর একটি হচ্ছে খুলনা জিলা স্কুলের অন্যতম জনপ্রিয় শিক্ষক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যকে হত্যা করা।
শিক্ষক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের বাড়ি লকপুর। যা বর্তমানে বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার মধ্যে। গ্রামটি একেবারে খুলনার রূপসা উপজেলা সংলগ্ন। এই মানুষটি ছিলেন একেবারে শিক্ষার্থী অন্ত-প্রাণ। তিনি শ্রেণীকক্ষে যেমন যতœ করে পড়াতেন, তেমনি ব্যক্তিগতভাবেও শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখতেন। গ্রামের ছেলেরা ঠিকঠাক লেখাপড়া করছে কি-না, তা তিনি ঘুরে ঘুরে দেখতেন। রাতের আঁধারে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি যেতেন। পড়াশোনার বিষয় নিয়ে খোঁজ-খবর করতেন। স্কুলে নিয়ে যেতেন। পড়া দেখিয়ে দিতেন। আর মানবিক বিকাশের সলতেটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে উসকে দিতেন। বলতেন, পড়াশোনা করতে হবে- জানার জন্যে, নিজেকে বিকশিত করার জন্যে, মা-মাটি-দেশকে ভালোবাসার জন্যে।
তখন মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী মুসলিম লীগ অনুসারী ও পাকিস্তান অনুসারীরা লুটপাট-অগ্নিসংযোগ-হত্যাকান্ড শুরু করেছে। নানা ধরণের অত্যাচার-নির্যাতনের কথা কানে আসছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই দেশ-ত্যাগ করছে। শিক্ষক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যকেও অনেকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলেন। কিন্তু জ্ঞানের মশাল জ্বালানো ব্যক্তি যিনি শিক্ষার্থীদের শিখিয়েছেন, মায়ের চেয়েও দেশ বড়, তিনি কি করে সেই দেশ ছেড়ে চলে যাবেন! তিনি চলে গেলে যে, দেশ-মাতাকে অসম্মাণ করা হবে, তাঁর সন্তানের চেয়েও প্রিয় শিক্ষার্থীরা অভিভাবক হারাবেন। একথা ভেবেই স্বজনদের তিনি বোঝালেন, তিনি বাড়ি ছেড়ে যাবেন না।  
স্বজনদের বেশীরভাগ সদস্যই এলাকা ছেড়ে চলে গেলেন। অনেকেই নিরাপদ স্থান ভারতে পাড়ি জমান। কিন্তু রয়ে যান রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য। শ্রেণীকক্ষের পাঠদানের পরিবর্তে তিনি এবারে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির অত্যাচার রুখে দিতে এগিয়ে আসেন। তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের ঐক্যবদ্ধ করেন। বলেন, ওই হায়েনাদের প্রতিরোধ করতে হবে। যারা পাকিস্তান রক্ষার নামে হিন্দু-মুসলমান বিভেদ তৈরি করছে, যারা লুটপাট করছে, যারা মানুষ হত্যা করছে; তারা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী, স্বাধীনতা বিরোধী; তাদেরকে প্রতিহত করতে হবে। তাঁর নেতৃত্বে শতাধিক শিক্ষার্থী ঐক্যবদ্ধ হয়। তারা প্রতিরোধ যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নেয়। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তিকে লড়াইয়ে পরাস্ত করার জন্যে তারা পথ খুঁজতে থাকে।
মহাপ্রাণ শিক্ষক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের এই উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী শক্তির নজরে পড়ে। তারা সচকিত হয়। স্থানীয় মুসলিম লীগ নেতা সোলায়মান চেয়ারম্যান একাধিকবার শিক্ষক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের নিকট আসেন। মুসলিম লীগের এই নেতা শিক্ষক রামকৃষ্ণকে তাঁর এসব কাজ হতে সরে আসার জন্যে বলেন। তাঁকে সতর্ক করেন, এমনকি ভয়ও দেখান। কিন্তু ন্যায়যুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করতে শেখানো মানুষটি কিভাবে পিছু হঠবেন! তাঁর কাছে পিছু হঠা মানে পালিয়ে যাওয়া। দেশপ্রেমিক কখনও পালিয়ে যেতে পারে না। শিক্ষক রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যও পালিয়ে যাননি, পিছুও হঠেননি।
আচমকাই এই শিক্ষকের বাড়িতে রাতের আঁধারে মুসলিম লীগের পান্ডারা আক্রমণ করে। তারিখটি ২৫ বা ২৬ এপ্রিল হবে। দুর্বৃত্তরা ওই বাড়িতে চড়াও হয়ে শিক্ষক ভট্টাচার্যকে উপর্যুপরি ধারালো অস্ত্রের আঘাত করে। আঘাতে আঘাতে তার গলা, বুক একেবারে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। তিনি ঘরের মেঝেতেই পড়ে ঘটনাস্থলেই মৃত্যুবরণ করেন। স্বজনরা রক্ষায় এগিয়ে এলে তারাও আক্রমণের শিকার হন। সেখানে আরও মারা যান স্বজন শৈলেন চ্যাটার্জী। মুখে ধারালো অস্ত্রের আঘাত লাগে আর এক স্বজনের। ভাইপো বরুণের হাতের আঙ্গুুলগুলো কাটা পড়ে।
তাঁর অন্যতম প্রিয় ছাত্র ডাঃ শেখ বাহারুল আলম তখন ১৮ বছরের কিশোর। তিনি ঘটনার পরপরই ছুটে গিয়েছিলেন সেখানে। তিনি ঘটনাটির বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘আমরা চেঁচামেচির শব্দ শুনি। বন্দুকেরও আওয়াজ শুনি। কিন্তু ঘটনাটি বুঝে উঠতে পারিনি। একটু পরে সবকিছু ঠান্ডা হলে আমরা জানার চেষ্টা করি, কি ঘটেছে। শব্দটি যেদিক থেকে এসছিল, সেইদিকে খোঁজ করতে গিয়ে স্যারের বাড়িতে গিয়ে বিস্মিত-হতবাক হয়ে যাই। একি দশা! মেঝেতে পড়ে আছে স্যারের ক্ষত-বিক্ষত দেহ। ওই শরীরে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন। ফুসফুস বেরিয়ে গেছে। রক্তে ভেসে আছে মেঝে। পাশেই শৈলেন বাবুর মৃতদেহ। অন্য আহতদের আর্তনাদ, গোঙানি; চিৎকার, কান্নাকাটি। সে এক ভয়ঙ্কর অবস্থা!’ এর দু’দিন পরই এলাকায় লুটেরার দল হামলে পড়ে।

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বদলে যাবে মংলা বন্দর

বদলে যাবে মংলা বন্দর

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০১













ব্রেকিং নিউজ