খুলনা | শুক্রবার | ২০ এপ্রিল ২০১৮ | ৭ বৈশাখ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

পারুলিয়ায় গণহত্যা- ১৯৭১

মোঃ জা ম সে দ আলম | প্রকাশিত ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:২১:০০

দিনটি ছিল ২৩ মে ১৯৭১ সাল বাংলায় ৯ই জ্যৈষ্ঠ পাকিস্তানী সামরিক জান্তার ভয়ে জীবন বাঁচাবার জন্য জন্মভূমি তথা মাতৃভূমির মায়া ত্যাগ করে মানুষ দলে দলে শরণার্থী হয়ে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে। ইছামতি নদী শাখা নদী পারুলিয়া শাপমারা খাল নামে পরিচিত। নৌকায় ভারতে যাওয়ার একমাত্র পথ। তখনও পাকিস্তানী সৈন্য ও রাজাকাররা পারুলিয়া ও সখিপুর বাজারে স্থায়ীভাবে ঘাটি স্থাপন করেনি। তৎকালীন খুলনা-বাগেরহাট-রামপাল-বরিশাল-পিরোজপুর-রামপাল-দাকোপ-বটিয়াঘাটার প্রায় তিন হাজারের মত নারী-পুরুষ-বৃদ্ধ-শিশুরা নৌকায় চড়ে এই শাপমারা খালের ওপর দিয়ে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করে। নৌকার পরিমাণ ছিল ২০০ খানা। নৌকার সারি প্রায় এক মাইল লম্বা ছিল। ঐ দিন বেলা ১১টার দিকে ৪ ট্রাক খান সেনা ও রাজাকাররা সাতক্ষীরা শহর থেকে পারুলিয়ার রোডের ওপর দিয়ে শ্যামনগর অভিমুখে যাচ্ছিল। ট্রাকগুলিতে এলএমজি ফিট করে সৈন্যরা তাক করে দাঁড়িয়ে ছিল। হঠাৎ পারুলিয়া ব্রীজের কাছে এসে খানেরা থমকে দাড়াল। কমান্ডারের অর্ডারে যে যার মত ট্রাক থেকে নেমে পূর্ব দিকে দৌড়ে নৌকাগুলির নিকটে যায় ফলে মাঝিরা ও শরণার্থীরা ভয়ে ভীতু হয়ে পড়ে। খান সৈন্যরা উর্দুতে তাদের অনেক কিছু জিজ্ঞাসা করলো কিন্তু তারাও উর্দু জানে না সে জন্য কোন কথার উত্তর দিল না। তখন পাক সেনাও রাজাকাররা ৫০/৬০ জন জোয়ান মানুষ নৌকা থেকে নামিয়ে আনলো। তাদেরকে সেড মাদ্রাসার ড্রেনের পাশে মাঠে দাঁড় করিয়ে দিল এবং উর্দুতে গালি গালাজ করতে করতে ব্রাশ ফায়ার করে তাদের সকলকে হত্যা করে।
এই দৃশ্য আশে পাশের অনেক লোক লুকিয়ে দেখলো। এদিকে নৌকা ভর্তি নর-নারী শিশুরা চিৎকার করে কাঁদতে লাগলো। তখন যেন পারুলিয়ার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। এই দৃশ্য দেখে নৌকার অনেক শরণার্থী পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করে। অনেকে হুড়োহুড়ি করে খালের পানিতে কাদায় পড়ে গেল। ব্রাশ ফায়ার করে ৫০/৬০ জনের হত্যা করার পর হায়েনার দল নৌকায় নিরস্ত্র নিরিহ মানুষদের ম্যাশিন গানের গুলি করে পাপড়া পাখির মত মারতে লাগলো। তারা মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করতে লাগলো। তখন পাক জান্তারা পুনরায় ব্রাশ ফায়ার করে তাদের জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিল। কিছু কিছু পেছনের নৌকা অবস্থা বেগতিক দেখে নৌকা ফিরিয়ে উল্টো দিকে নিয়ে পালিয়ে বাঁচলো। পাক জান্তারা যখন বুঝল কেউ আর বেঁচে নেই তখন তারা পুনরায় ট্রাকে ফিরে এসে চড়ংরঃরড়হ নিয়ে শ্যামনগর অভিমুখে যাত্রা করলো। নিহত মানুষগুলির শরীর থেকে রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে এলো ফলে সমস্ত নদীর পানি মুহুর্তের মধ্যে লাল হয়ে গেল রক্তের গন্ধ পেয়ে কোথা থেকে কুকুরগুলো ঘেউ ঘেউ করে ডাকতে লাগলো। নদীর লাল পানি পান করলো। এক সময় নদী জোয়ারের পানিতে ভরে গেল তখন লাশগুলি ভাসতে ভাসতে নদীর কিনারে ও আশে পাশের জমিতে ঠাই পেল। এদিকে নদী থেকে যে সব শরণার্থী পালতে পেরেছিল এবং যে নৌকাগুলো উল্টো দিকে পালিয়েছিল সন্ধ্যার পর তারা পায়ে হেটে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় ভারতের টাকিতে পৌঁছে গেল। অনেকে স্বামীকে-স্ত্রীকে-বাবা-মা কন্যা পুত্রকে হারিয়েছে এই পারুলিয়া গণহত্যায়। সেদিনের সেই বিভিষিকাময় ঘটনা বাংলাদেশ স্বাধীন হলে সকলেই মনে করে তখন খান সেনাদের-রাজাকারদের ঘৃণা করে। ৩০ লক্ষ শহীদের মধ্যে পারুলিয়া গণহত্যার মানুষগুলির নাম থাকবে। ১৯৭১ সালে ২৩ মে সাতক্ষীরা জেলার পারুলিয়া সখিপুর মানুষদের কাছে এক স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে পারুলিয়া গণহত্যা ১৯৭১ সাল। যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো ৪ ট্রাক খানসেনা শ্যামনগর থেকে ফিরে সাতক্ষীরায় গেল। নদীতে যখন জোয়ারের পানি কমতে শুরু করলো অর্থাৎ ভাটা হতে লাগলো তখন লাশগুলির উপর কুকুর শিয়াল লাফিয়ে পড়ল। দিনের বেলায় শকুন, কাক, শিয়াল, চিল, কুকুর লাশের মাংস খেতে শুরু করল। এই ভাবে ১০-১৫ দিন যাবত প্রাণীগুলি লাশের মাংসগুলি ভক্ষণ করলো। শরণার্থীদের লাশের পঁচা গন্ধে মানুষ হাট-বাজারে থাকতে পারতো না। চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না কি হৃদয় বিদারক দৃশ্য। সে দিনের সেই গণহত্যার কাহিনী আজও মানুষের মনে পড়ে। ১৯৭১ সালে ২৩ মের ঘটনা অর্থাৎ গণহত্যার দিবসটি পালন করার জন্য এবং পারুলিয়া মাদ্রাসার নিকট গণহত্যার জায়গাটি চিহ্নিত করার জন্য বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও সংস্কৃতিক সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে। সেই সাথে প্রজন্ম ৭১ এবং বর্তমান প্রজন্মকে এ বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম তারা হয়তো কাজগুলি করতে পারিনি। আমাদের অসমাপ্ত কাজগুলি তোমরা সমাপ্ত করবে তবেই তো গণহত্যার যারা শহীদ হয়েছে তখনই তাদের আত্মা শান্তি পাবে। সমগ্র বাংলাদেশে যতগুলি বধ্যভূমি আছে সেই তালিকায় যাতে পারুলিয়া গণহত্যা ১৯৭১ সাল জাতীয় বধ্যভূমির তালিকায় স্থান পায় সে চেষ্টা সম্মিলিতভাবে করতে হবে। এখানে গণহত্যার স্মৃতি চিহ্ন তৈরী করা সম্ভব যেটা দেখে পাক সেনাদের দোসরদের মানুষ ঘৃণা করবে এটাই হোক আজকের কামনা। রাজাকার-আলবদর-আল সামস ও পিছ কমিটির লোকদের যেন চিরদিন মানুষ ঘৃণা করে।

 

 

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বাঙলার বৈশাখ : বাঙালির বৈশাখ

বাঙলার বৈশাখ : বাঙালির বৈশাখ

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৯

বর্ষবরণ-১৪২৫

বর্ষবরণ-১৪২৫

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৫২

বাংলা পঞ্জিকা ও বাংলার আবহাওয়া

বাংলা পঞ্জিকা ও বাংলার আবহাওয়া

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৫০






বৈশাখে দেশী মজাদার খাবার

বৈশাখে দেশী মজাদার খাবার

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৫

নতুনের আহ্বান

নতুনের আহ্বান

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৫

বোশেখ 

বোশেখ 

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৫

বৈশাখের আমেজ

বৈশাখের আমেজ

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৪


ব্রেকিং নিউজ











অভিযোগ খারিজ 

অভিযোগ খারিজ 

২০ এপ্রিল, ২০১৮ ০১:৪০