খুলনা | মঙ্গলবার | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ১০ আশ্বিন ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

যুদ্ধকালীন স্মৃতি

একে এম সামসুদ্দিন সালাম | প্রকাশিত ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:১৭:০০

যুদ্ধকালীন স্মৃতি

একাত্তরে ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু’র ঘোষণা শোনার পর আমরা পশ্চিম পাকিস্তানে সাময়িক বাহিনীতি চাকুরি রত সৈনিকরা জীবন রক্ষার্থে খুব আতংকে দিন কাটাচ্ছিলাম। আমরা বুঝতে পারলাম ইয়াহিয়া খান বাঙালিদের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। তখন হতে আমরা বাঙালি সৈনিকরা যে যেভাবে পারি পশ্চিম পাকিস্তান হতে পালাতে আরম্ভ করি। আমি একাত্তরের ১৭ এপ্র্রিল পাকিস্তানের শিয়ালকোট ক্যান্টনমেন্ট হতে দেশে চলে আসি। একাত্তরের ৭ই জুলাই মোল্লাহাটের গাংনী হতে বিরাট বাহিনী নিয়ে ভারতে যাই এবং ১৭ জুলাই ভারতের বশিরহাট বাকুন্দিয়া ক্যাম্প হতে আমার বাহিনীকে নেতৃত্বে অস্ত্র প্রদান করা হয়। আমি সেই ব্যক্তি মুজিবনগর হতে সর্ব প্রথম নর্থ খুলনায় অস্ত্র নিয়ে আমি এইভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। যখন মোল্লাহাটের সদর থানা পাকসেনা ও রাজাকারদের দখলে ছিল, ঠিক ঐ সময় আমি অস্ত্রে সজ্জিত বিরাট বাহিনী নিয়ে মোল্লাহাটের গাংনীতে অবস্থান করি।এই খবর প্রচার হওয়ার সঙ্গে বাগেরহাট পিরোজপুর, কাউখালির হাজার হাজার হিন্দু শরণার্থী আমাদের গ্রামে আশ্রয় নিতে থাকে। ঠিক ঐ সময় পাকসেনা ও রাজাকাররা বঙ্গবন্ধুর গ্রামের বাড়ী টুঙ্গীপাড়া আক্রমন করে সাথে সাথে বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শহীদ শেখ আবু নাছের মোল্লাহাটের গাংনী গ্রামকে নিরাপদ মনে করে তার পরিবারকে আমাদের বাড়ীতে পাঠিয়ে দেন। আমি ২৯ অক্টোবর মোল্লাহাটের চরকুলিয়া ফজলু মোক্তারের বাড়ীতে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প স্থাপন করি, আমাকে যুদ্ধে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করিয়াছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈনিক মোসলেম আলী খান, সৈনিক মোস্তফা ও সৈনিক মোঃ হানিফ। এই যুদ্ধের একদিন আগে জানতে পারি পাকসেনা ও রাজাকাররা মেজর সেলিম এর নেতৃত্বে চরকুলিয়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প আক্রমণ করতে আসছে। আনুমানিক আমাদের ক্যাম্পের এক মাইল উত্তরে আক্রমণ প্রাতিহত করার জন্য পজিশন নিয়ে প্রস্তুত থাকি। পাকসেনারা আমাদের গুলির সীমানার এসে গেলেই আমাদের হঠাৎ আক্রমণে পাকবাহিনী হতবিহব্বল হয়ে পড়ে। প্রথম আক্রমণেই পাকবাহিনী মেজর সেলিম মারা যাওয়ার তারা পাল্টা আক্রমণ করতে ব্যর্থ হয়। এই খবর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে বার বার আমার নাম সালামের নেতৃত্বে মোল্লাহাটে  চাকুলিয়ার (চরকুলিয়া) ঘোরতর যুদ্ধ চলছে বলে প্রচার করা হয়। দ্বিতীয় যুদ্ধঃ মোল্লাহাটের আলিমুন্দিন খাল বরাবর পাকসেনা রাজাকারদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল যুদ্ধ হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের একত্রে উপর্যুপরি গ্রেনেড ও গুলির আক্রমণে পাক সেনারা ভোর হতেই পচ্চাদাপসরণ করে মোল্লাহাটে ফিরে যায়। তৃতীয় যুদ্ধঃ এই যুদ্ধ বর্তমান রূপসা উপজেলার বামনডাঙ্গায় হয়। পাকসেনাদের ধারণা ছিল শিয়ালী চাঁদপুর হয়ে তারা গাংনী হাইস্কুল ক্যাম্প স্থাপন করবে। তাই আমি বাধ্য হয়ে গাংনী হাইস্কুলের দোতলার সিড়ি ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেই এই বিকট শব্দে সোনার পর পাকসেনারা সামান্যতম প্রতিরোধ করে খুলনার অভিমুখে ফিরে যায়। এই যুদ্ধে মোজাম্মেল নামে আমার একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়। এ্যাডভোকেট বীর মুক্তিযোদ্ধা মোল্লা মুজিবুর রহমানের বাগান বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়। এখানে বহু রাজাকার আমার কাছে অস্ত্র স্যারেন্ডার করে এবং বাগেরহাটের কুখ্যাত রাজাকার রজব আলী ফকিরের একদল রাজাকার বিল পথে আমার কাছে অস্ত্র স্যারেন্ডার করে। বামনডাঙ্গা, চাঁদপুর, শিয়ালী মুক্তি হওয়ার পর আমার বাহিনী নিয়ে সেখপুরা, আজগড়া হয়ে পালেরহাটের পাশে কাউন্সিল অফিসে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প স্থাপন করি। পালেরহাটের কাউন্সিলর অফিসের সামনে ইটের পোল নামক স্থানে রাজাকারদের সঙ্গে আমাদের সামান্যতম যুদ্ধ হয় এবং রাজাকাররা অস্ত্র আত্মসমর্পন করে। তাদের নেতৃত্ব ছিল রায়েরমহলের মনু শেখ। মনু শেখ মৃতঃ বীর মুক্তিযোদ্ধা খয়বার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবজাল এর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। এই শান্তি কমিটির প্রধান মনু শেখকে ইটের পোলের কাছে একটি বাড়ীতে আত্মগোপন করে থাকা আবস্থায় আটক করা হয় এবং সাথে সাথে তাকে খুলনা জেল হাজতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এর পর আমরা অগ্রসর হয়ে বেলফুলিয়া হাইস্কুলে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প স্থাপন করি। পরে হঠাৎ আমার দায়িত্ব পড়ে শোলপুর, স্টার জুট মিল, চন্দনীমহল, সেনহাটী ইত্যাদি অঞ্চল। আমি মিত্র বাহিনীকে ক্যাবল ফ্যাক্টরী বরাবর নদী পার করিয়ে চন্দনীমহল নিয়ে আসি। তখন চন্দনীমহলের আওয়ামী লীগ নেতা মৃত চেয়ারম্যান আব্দুল হালিমের পিতা- গাজী আরিফ হোসেন আমার বাহিনীকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করে ছিলেন। ১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১ প্রায় দুইশত রাজাকার স্টার জুট মিলে আমার কাছে অস্ত্র স্যারেন্ডার করে। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর স্টার জুট মিলের একজন দারোয়ান স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের সময় নদীর অপর পাড়ের পাক সেনার গুলিতে শহীদ হন। মিলে চাকুরিরত একজন লোক আমাকে ডেকে নিয়ে একটি কবর দেখালেন। তারা যখন প্লাটিনাম জুট মিলের মধ্যে দিয়ে নদী পার হতে ছিল, ঠিক এ সময় পাক সেনাদের তত্ত্বাবধানের ছিলেন স্টার জুট মিলের ইঞ্জিনিয়ার রেজা হোসেন। তারই চোখের ইশারায় পাক সেনারা আমার ভাইজিকে নিয়ে যায়। টেনে হিঁচড়ে নিয়ে সময় আমার ভাইজি কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল কাকা আমাকে রেখে যাচ্ছেন। কাকি আমাকে রেখে যাচ্ছেন। এরপর পাক সেনাদের পা জড়িয়ে বলতে লাগল স্যার আমাকে চেড়ে দিন! আমি একজন মুসলমানের মেয়ে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি! তার কোন আকুতি মিনতিতে কাজ হল না। পর দিন মাঝিরা রক্তাক্ত অবস্থায় আমার ভাইজির লাশ আমার কাছে হস্তান্তর করে। সেই কবর আপনাকে দেখালাম। সাথে সাথে ঔ ইঞ্জিনিয়ার রেজা হোসেনকে ধরে এনে ঐ মেয়েটার রক্ত মাখা কাপড় তার গায়ে জড়িয়ে তাকেও হত্যা করা হয়।

 

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বদলে যাবে মংলা বন্দর

বদলে যাবে মংলা বন্দর

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০১













ব্রেকিং নিউজ