খুলনা | সোমবার | ১১ ডিসেম্বর ২০১৭ | ২৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪ |

Shomoyer Khobor

‘বড় বোনের সাথে গার্লস স্কুলেই লেখাপড়ার হাতেখড়ি’

চাকুরি সূত্রে বিএল কলেজে এসে খুলনা শহরটাকে ভালোবেসে ফেলেন প্রফেসর সাইদুল হাসান

আশরাফুল ইসলাম নূর | প্রকাশিত ০৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০১:১০:০০

“১৯৭৪ সালে সরকারি বিএল কলেজে উদ্ভিত বিদ্যা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করে প্রথম খুলনা শহরে আসি। মনোরম, নির্জন, শান্ত পরিবেশ দেখে খুলনা শহরটাকে ভালোবেসে ফেলি। তাই স্থায়ী নিবাস গড়ে তুললাম খুলনাতেই। যদিও এখন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। এখন তো রাস্তায় বের হতেই ভয় পাই। না জানি কখন গাড়ি চাপা দিয়ে দেয়! চারিদিকে মাদক আর আকাশ সংস্কৃতিতে ছেয়ে গেছে। এখন তো বড়দের সম্মান আর ছোটদের স্নেহ করাই ভুলে গেছেন সবাই। আমাদের ছোটবেলায় এমন পরিবেশ ছিল না।” স্মৃতিচারণের শুরুতেই খুলনা শহরের একাল-সেকাল নিয়ে এমনি কথা বললেন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড যশোরের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর সাইদুল হাসান।
তৎকালীন বৃহত্তর ফরিদপুরের রাজবাড়ীতে ১৯৫০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন প্রফেসর সাইদুল হাসান। কর্মজীবনে তিনি সরকারি বিএল কলেজ, আযম খান সরকারি কমার্স কলেজ, এম এম সিটি কলেজ ও সুন্দরবন আদর্শ মহাবিদ্যালয়সহ বিভিন্ন কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। বর্তমানে সিনিয়র সিটিজেন এ্যাসোসিয়েশন খুলনার সভাপতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত রয়েছেন।
প্রবীণ শিক্ষক সাইদুল হাসান বলেন, “শৈশবের স্মৃতি বলতে আমি চুয়াডাঙ্গাতে বড় বোনের সাথে গার্লস্ স্কুলে যেতাম। সেখানেই আমার হাতে খড়ি। আমার পিতা মরহুম মোঃ আব্দুর রহমান পুলিশের বিশেষ শাখায় (ডিএসবি) পিআইও পদে চাকুরি করতেন। তার চাকুরির সুবাদে গৃহিনী মা মরহুম মোছাঃ সাহিদা খাতুনসহ তিন ভাই, তিন বোনের পরিবার বাবার সাথেই বিভিন্ন স্থানে গিয়েছি। কুষ্টিয়া ইউনাইটেড স্কুলে ক্লাস টু-থ্রী পড়লাম। তারপর মাদারীপুরে শকুন্তলা প্রাইমারি স্কুলে, পরে মাদারীপুরে ইউনাইটেড হাইস্কুলে পড়াশুনা করেছি। সেখান থেকে ফরিদপুর জিলা স্কুলে গেলাম। তিনি বলেন, “ছোট বেলায় প্রচন্ড ঘুড়ি উড়াতাম, হা-ডু-ডু, ফুটবল খেলতাম। তবে পারিবারিক ভাবেই লেখাপড়ার প্রতি প্রচন্ড কঠোরতা ছিল। খেলাধুলা করলেও কোন বাজে আড্ডা, অসৎ সঙ্গ ছিল না। আমরা যারা এক সাথে খেলতাম, পড়ালেখা করেছি, তারা সকলেই স্ব-স্ব স্থানে সুপ্রতিষ্ঠিত। আজকের সমাজে তো ছেলে-মেয়েরা সকালে ব্যাগ নিয়ে বের হয়, কোথায় যায়, না যায় অভিভাবকরা কোন খোঁজ রাখছেন না। নিত্য-নতুন মাদক ও আকাশ সংস্কৃতিতে ডুবে আছে শিক্ষার্থীরাও। শিক্ষার্থীদের এ থেকে বের হতে হবে” বলে মনে করেন এই আপদমস্তক শিক্ষক।
তিনি বলেন, “আমি ১৯৬৫ সালে ফরিদপুর জিলা স্কুল থেকে এসএসসি, রাজেন্দ্র কলেজ থেকে এইচএসসি ১৯৬৭ সালে ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ সালে বিএসসি (অনার্স) পাস করি। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করেছি। শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ আমার ছোট বেলা থেকেই। ক্লাসে কখনোই অনুপস্থিত থাকতাম না, শিক্ষকদের প্রতি ছিল গভীর ভক্তি। আমিও ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে ভক্তি-শ্রদ্ধা পেয়েছি। তবে আজকে সেটা আর দেখা যায় না। প্রতি দিনই পত্রিকায় খারাপ খবর দেখে মনটা খারাপ হয়ে যায়। নীতি- নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শিক্ষার অভাবে সারাদেশে অপরাধ প্রবনতা বেড়েছে, বাড়ছে।”
মুক্তিযুদ্ধের সময়কার সেই ভয়াল স্মৃতিতে এখনো আতকে উঠেন উল্লে¬খ করে প্রফেসর সাইদুল হাসান বললেন, “মুক্তিযুদ্ধের সময়কার একটি পতাকা আমি বড় বোনের কাছ থেকে বানিয়ে নিয়েছিলাম। খুব উৎসাহে রাজবাড়ীতে পতাকাটি আমি-ই হয়তো প্রথম উড়াবো। সে সময়ের এমপি হেদায়েত কাজী আমার আব্বাকে ডেকে বললেন, এখন ওই পতাকা উড়িয়ে কাজ নেই, কালো পতাকা উড়াচ্ছে, সেটাই উড়াতে বলুন। পাক আর্মি এলাকায় আসলে প্রায়ই আমরা কবরস্থানে গিয়ে কবরের মধ্যে লুকিয়ে থাকতাম। কবরের মধ্যে ভয়ও লাগতো। তার চেয়ে বেশি ভয় করতো যদি পাকবাহিনী দেখে ফেলে তাহলে আর নিস্তার নেই। সেই সময়কার ভয়াল স্মৃতি মনে পড়লে এখনো ভয় লাগে। আমাদের কুষ্টিয়ার বাড়িতো পুড়িয়েই দিয়েছিল ওরা।”
আত্মজীবনী বর্ণনায় তিনি বললেন, “কর্মজীবনের শুরুতেই মাদারীপুর নাজিম উদ্দিন কলেজে প্রভাষক পদে ১৯৭৩ সালের ৮ মার্চ যোগদান করি। সেখানে কয়েক মাস চাকুরির পর রাজবাড়ী কলেজ, মোমেনসাহী ক্যাডেট কলেজে শিক্ষকতা করেছি। এরপর তো ১৯৭৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর সরকারি বিএল কলেজে উদ্ভিত বিদ্যা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করতে প্রথম খুলনা শহরে আসি। তখন তো খুলনা শহর ছিল মনোরম, নির্জন, সুশীতল-শান্ত পরিবেশের আরামদায়ক শহর। খুব ভালো লাগতো শহরটা তখন। এখন তো রাস্তায় বের হতেই ভয় পাই, কি জানি গাড়ি চাপা দিয়ে দেয় কি না!”
কাজের কথায় ফিরে আসি, বলে দম ছেড়ে আবারও বললেন, “১৯৭৭ সালের ১০ জানুয়ারি প্রেষণে জেলা জনসংখ্যা শিক্ষা অফিসার হিসেবে ১৯৮৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছি। তবে শিক্ষকতায় পড়ে রইল আমার মন-মস্তিষ্ক। এর মধ্যে ১৯৮১ সালের ১২ মার্চ নড়াইলের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের মেয়ে মাসরুরা রহমানের সাথে পারিবারিক আয়োজনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। পারিবারিক আয়োজনে বিয়ে হলেও আমার পছন্দ ছিল বসন্তকালে আমি বিয়ে করবো। কবি-সাহিত্যিকদের বিভিন্ন লেখায় এমনি আগ্রহ ছিল আমার, সেটাই করেছি-বসন্তকালে বিয়ে। তবে বসন্তে বিয়ে করতে গিয়ে বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয়। ঝড়-বৃষ্টিতে বিয়ে বাড়ির প্যান্ডেল ও সাজ-সজ্জা সব ভেঙে-চুরে গুড়িয়ে যায়।” কথা শেষ করে একটু হাসলেন তিনি। বললেন “সহধর্মিনী মাসরুরা রহমান খুলনার সরকারি এম এম সিটি কলেজে ভূগোলের অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন”।
এরপর তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, “১৯৮৫ সালের ১ অক্টোবর সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি নিয়ে যোগদান করি। সে পদে থাকলাম ২০০০ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত। ওই দিনেই সরকারি এম এম সিটি কলেজে উপাধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করি। সেখান থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়ে পটুয়াখালী সরকারি কলেজে যোগদান করি। ২০০২ সালের ১২ আগস্ট উপাধ্যক্ষ হিসেবে আযম খান কমার্স কলেজে যোগ দেই। ২০০৪ সালের ২০ ফেব্র“য়ারি সরকারি সিটি কলেজের অধ্যক্ষ পদে যোগদান করি। ওই বছরের ১ সেপ্টেম্বর খুলনার সুন্দরবন সরকারি আদর্শ মহাবিদ্যালয়ে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দিলাম। ২০০৬ সালের ২৩ মার্চ সরকারি বিএল কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করি। তবে কর্মজীবনে বহু স্মৃতি, অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের ঘটনা ঘটেছে।”
বিএল কলেজের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “বিএল কলেজের সুবোধ চন্দ্র ছাত্রাবাসে সীমানা প্রাচীর না থাকায় বহিরাগত ও ইতর প্রাণীর অত্যাচারে আবাসিক ছাত্ররা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। পড়াশুনার ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছিল তাদের। এ কথা শুনে নিজেই উদ্যোগ নিয়ে সীমানা প্রাচীর নির্মাণের ব্যবস্থা করেছিলাম। সব সময় শিক্ষার্থী-শিক্ষক সহকর্মীদের সাথে মন খুলে মিশেছি। হাসি মুখে অনেক জটিল সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান করেছি।” একটু থেমে আবার তিনি বললেন, “২০০৭ সালের ১৪ মার্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড যশোরের চেয়ারম্যান পদে যোগদান করি। আর ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর আবারও বিএল কলেজে যোগদান করে, সেই দিনেই অবসরে চলে আসি।”
হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, “আমার মেয়ে সোহানা বিনতে সাঈদ কুয়েট থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং করেছিল আর ছেলে সাদমান সাঈদ একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করলো। ওদের নিয়ে নগরীর ৭৩, সুলতান আহমদ রোডের ‘ব¬ু মুন’ নামের এই বাড়িটিতে আল্ল¬াহ ভালো রেখেছেন। অবসরে পড়াশুনার পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সাথে কাজ করি। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতির উপদেষ্টা ও সিনিয়র সিটিজেন এ্যাসোসিয়েশন খুলনার সভাপতিসহ কয়েকটি সংগঠনে আছি। শৈশব ও কৈশরে আমি হলুদ রঙের পোশাক বেশি পছন্দ করতাম, বয়স হয়েছে, এখন অবশ্যই সাদা ও আকাশী রং বেশি পছন্দ করি। ডাল-ভাত ও গরুর গোশতের প্রতি কিছুটা দুর্বলতা রয়েছে আমার। তবে হ্যাঁ, অবসরেও প্যান্ট-শার্ট, কোর্ট পরে সব সময় টিপটাপ থাকতে পছন্দ করি আমি।”

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ



বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

১১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০১:১৬











ব্রেকিং নিউজ



বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

১১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০১:১৬