খুলনা | সোমবার | ২৩ জুলাই ২০১৮ | ৮ শ্রাবণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor
নিজস্ব প্রতিবেদক

সিটি কর্পোরেশনকে সেজন্য ট্যাক্স দেয় নগরবাসী : এনায়েত আলী

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত ৩১ জানুয়ারী, ২০১৭ ০১:০০:০০

“সেবা প্রাপ্তি জনগণের অধিকার, করুণা নয়। সেজন্য সিটি কর্পোরেশনকে ট্যাক্স দেয় নগরবাসী। তবে ব্যর্থতার জন্য শুধু সিটি মেয়রকেই দায়ী করলে হবে না, জাতীয় সরকারকেও আন্তরিক হতে হবে।” এমনি দাবি রেখে ১৯৭৭-৮২ সালের তৎকালীন খুলনা পৌরসভা চেয়ারম্যান এড. এনায়েত আলী বলেছেন, “নতুন করে কোন অবকাঠামো নির্মাণ তো করা হচ্ছে না, তবে শুধু সংরক্ষণাবেক্ষণ ও নাগরিক সেবা দিতে পারছে না কেন কেসিসি?” “আমরা জানি জনসংখ্যা বেড়েছে জ্যামিতিক হারে, আর নাগরিক সেবার চাহিদা মিটছে গাণিতিক হারে। ফলে চাহিদার সাথে যোগানে নাগরিক সেবার ব্যাপক একটা ব্যবধান থেকেই যাচ্ছে। তবে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি নগর পিতার সজাগ দৃষ্টি থাকলেই নগরবাসীর ন্যায়সঙ্গত্ব সেবা দেয়া সম্ভব হতে পারে।” গত বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরীর ২১ তালতলা মসজিদ রোডের জনি হাউজে তার বাস ভবনে বসে সময়ের খবর’র সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে উপরোক্ত কথাগুলো বলেছেন।
তিনি বলেন, ‘নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে কেসিসি’র মেয়রকে প্রথমত্ব ৫টি বিষয়কে গুরুত্বারোপ করা উচিত। তা হল কঞ্জারভেন্সি (পরিস্কার-পরিছন্নতা), ওয়াটার সার্ভিস (বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও পানি নিষ্কাশন), স্টিট লাইট (নিরবিচ্ছিন্ন সড়ক বাতি), সড়ক (জটমুক্ত নির্বিঘেœ যোগাযোগ ব্যবস্থা) ও স্বাস্থ্য সেবা (চিকিৎসা ও পরিবার পরিকল্পনা)। এছাড়াও অন্যান্য নাগরিক চাহিদা রয়েছে। তবে উপরোক্ত পাঁচটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে মোটামুটি নাগরিক সনদ বা সিটিজেন চার্টার’র সিংহভাগ সেবা নগরবাসী পাবেন। অবশ্যই এ জন্য সেবা গ্রহীতা নগরবাসীরও ন্যায় অধিকার পাইতে সচেতন হওয়া জরুরি’ বলে মনে করেন তিনি। ‘জন্ম সনদ থেকে শুরু করে মৃত্যু সনদ পর্যন্ত এর মধ্যকার জীবনের যাবতীয় মৌলিক সেবাগুলো দিতে হবে সিটি কর্পোরেশনকেই। এমনকি মৃত্যুর পর একজন নাগরিকের দাফন-কাফনের বিষয়টি দেখার দায়িত্ব পড়ে। অনেকেই হয়তো আমার সাক্ষাৎকার পড়ে ভাববেন-বলা সহজ, কিন্তু করা কঠিন। আমি তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, মানুষ যা ভাবে তাই কিন্তু করে। আমরাও চেষ্টা করলে পারবো।’
১৯৭৭ থেকে ১৯৮২ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের খুলনা পৌরসভার ২য় চেয়ারম্যান ছিলেন সে সময়কার যুবক এড. এনায়েত আলী। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে ভোটের লড়াইয়ে খুলনা শহরের মানুষের সেবক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। এখন তিনি আশিতিপর।
প্রবীণ এই জনপ্রতিনিধি ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, ‘নগরীর পিটিআই মোড়, নিরালা মোড়, ফুলমার্কেট মোড় (একটি ক্লিনিকের সামনে) সাত রাস্তার মোড় ও ময়লাপোতা মোড়ের মাঝখানেসহ খালিশপুর ও দৌলতপুরসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে ময়লার স্তুপ। রাস্তার মানুষ দুর্গন্ধে নাক চেপে ধরছে। এটা মানুষের ঘৃণারও বহিঃপ্রকাশ। একটা রাস্তা নির্মাণের এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে পিচ উঠে যাচ্ছে। শহরের প্রত্যেকটি রাস্তায় অফিস টাইমে যানজটের ব্যাপকতা বাড়ছে। যেখানে ৫/৬ মিনিটে আমার বাসা থেকে কোর্টে (আদালতে) পৌঁছানোর কথা, সেখানে আধা ঘন্টারও বেশি সময় লাগছে কোন কোনদিন।
সিটি কর্পোরেশন এখন নাগরিক সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে মন্তব্য করলেন তিনি। তবে এ ব্যর্থতার জন্য শুধু সিটি মেয়রকেই দায়ী করতে চান না তিনি। এনায়েত আলী বললেন, ‘জাতীয় সরকারকেও আন্তরিক হতে হবে। খুলনা সিটির মানুষের প্রয়োজন বা চাহিদা বোঝা উচিত। জাতীয় বাজেটে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দেয়া উচিত। সে ক্ষেত্রে পূর্বেই সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের কাছে আয় ও চাহিদার তালিকা সংগ্রহ করতে পারেন বাজেট প্রণয়ন কমিটি। কিন্তু সেটাও সরকার করছে না। আসলে রাজনীতির দলীয় বিরোধীতা এখন খুব নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বিরোধীতার খাতিরে বিরোধীতা। এ অবস্থা সুখকর খবর নয়। জনপ্রতিনিধিদের উচিত দল-মতের উর্ধ্বে উঠে জনসেবা করা। আবার জনগণেরও উচিত গঠনমূলক সমালোচনা করা।’
নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। উদহারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘নগরীর আর্বজনা একটি নির্ধারিত প্লানে জৈব সার তৈরি করা যেতে পারে। একই সাথে সেই আর্বজনা থেকে উৎপাদন হবে গ্যাস বা বিদ্যুৎ শক্তিও। উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে এমন কয়েকটি প্লান করলে নগরবাসীর বর্জ্য দিয়েই নগরবাসীকে সেবা দেয়া সম্ভব। তাতে ময়লা-আর্বজনাও পরিবেশ দুষণ না করে সুষ্ঠুভাবে ডাম্পিং হবে। একই সাথে নগরীতে জনসংখ্যা মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আনতে পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।’
দীর্ঘ আলাপচারিতায় এ প্রতিবেদকের সাথে তাঁর সময়কার বিভিন্ন উদহারণ তুলে ধরে বর্তমান জনপ্রতিনিধিদের আন্তরিকতা, সততা ও ন্যায়-নিষ্ঠার সাথে কাজ করার আহŸান জানিয়েছেন তিনি। এড. এনায়েত আলী মনে করেন- একদিন আমরা কেউ থাকবো না, তবে আমার কর্ম থাকবে। সে ইতিহাস অনুযায়ী পরবর্তী প্রজন্ম আমাদের মূল্যায়ন করবে।
জনপ্রতিনিধিদের জন্য পরামর্শ রেখে তিনি বললেন, ‘দল-বল নিয়ে নয়, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলকে না জানিয়ে নিজের ড্রাইভারকে নিয়ে একাকী নগরী পরিদর্শন করে দেখুন নগরবাসীর কি সমস্যা। সেটা নিজে দেখেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। তবেই খুলনাবাসীর হৃদয়ে ঠাঁই করে নিতে পারবেন হন প্রিয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে। মনে রাখতে হবে-সেবা প্রাপ্তি জনগণের অধিকার, করুণ নয়। সে জন্য সিটি কর্পোরেশনকে ট্যাক্স দেয় নগরবাসী।

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন






ব্রেকিং নিউজ