খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২১ জুন ২০১৮ | ৭ আষাঢ় ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor
কাজী মোতাহার রহমান

মওলানা ভাসানীর পছন্দে ছিল নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীক

কাজী মোতাহার রহমান | প্রকাশিত ৩১ জানুয়ারী, ২০১৭ ০০:৫৯:০০


নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীক দু’টো এ ভূ-খন্ডের মানুষের কাছে খুবই পরিচিত। মূলতঃ এই দু’প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্ব›িদ্বতা হচ্ছে ৪৩ বছর ধরে আমাদের নির্বাচনী রাজনীতিতে। বিশেষ করে ১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে তুমুল প্রতিদ্ব›িদ্বতা এই প্রতীক দু’টোর মধ্যে। দেশের ভোটারদের সমর্থন মূলতঃ নৌকা ও ধানের শীষের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ বছর এই প্রথমবার ইউপি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ব্যবহৃত হয়। তা নিয়ে নানা কথা। আঁচ করা যাচ্ছে জেলা পরিষদ নির্বাচনেও দলীয় প্রতীক থাকবে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চিন্তা চেতনার বাইরে যেতে পারেননি ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান, জাসদ সভাপতি কমরেড হাসানুল হক ইনু এবং মুহাতারাম মুফতি ফজলুল হক আমিনী। কমরেড মেনন দীর্ঘদিনের শ্রমজীবী জনতার প্রতীক হাতুড়ী ফেলে, আর বিপ্লবের জ্বলন্ত শিখা মশাল ছেড়ে কমরেড ইনু নৌকা প্রতীক নিয়ে জয়ী হয়েছেন। নবম সংসদে মরহুম মুফতি ফজলুল হক আমিনী ধানের শীষ প্রতীকে জয়ী হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পান। যে প্রতীক দু’টো নিয়ে আজকের লড়াই সংগ্রাম, খুনোখুনি, নেতার বাড়ির সামনে যেয়ে ধন্যা দেয়া বা স্বল্প সময়ের নানা কিছুর বিনিময়ে প্রার্থীর নিয়ন্ত্রণে রাখা তার আবিস্কার করেন মজলুম জননেতা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। তার অনন্য গুণাবলীর একটি তিনি হাটতেন অবিরাম ক্লান্তিহীন। যানবাহনের জন্য বসে থাকতেন না। যানবাহনের মধ্যে তার সবচেয়ে পছন্দ ছিল নৌকা। সৈয়দ আবুল মকসুদ রচিত মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে তিনি যুক্তফ্রন্টের নৌকা প্রতীক পছন্দ করেছিলেন। সে সময় এ ভূ-খন্ডে সবার মুখে শ্লোগান উঠে যায়-‘তোরা কে কে যাবি আয়, হক-ভাসানীর নায়।’ ১৯৭০ সালে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক অভূতপূর্ব সাফল্য বয়ে আনে। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাপ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করে। ১৯৭৬ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। ১৯৭৯ সাল থেকে বিএনপি’র নির্বাচনী প্রতীক ধানের শীষ। মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী জাতীয়তাবাদী, সমাজবাদী ও আন্তর্জাতিকতাবাদী নেতা। তিনি কমিউনিষ্ট ছিলেন না, মার্কসবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করতেন না। শোষিত-বঞ্চিত মানুষের ভাত-কাপড়ের অধিকারের দাবিতে আন্দোলন করেছেন। সমাজতন্ত্রের একজন অবিচল প্রবক্তা। ৪৭ পরবর্তী এদেশের রাজনীতিতে বিপ্লবী ও ভাত-কাপড়ের লড়াইকে জনপ্রিয় করে তোলেন। আমৃত্যু ছিলেন দেশের মানুষের পক্ষে। রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান না হয়েও অথবা মন্ত্রী পর্যায়ের কোন পদে অধিষ্ঠিত না হয়েও পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক ও জোট নিরপেক্ষ বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি ছিলেন বিশ্ব শান্তি পরিষদের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সভাপতি। মহাত্ম গান্ধী সম্পর্কে মওলানা ভাসানী বলেছেন, তার অহিংসার নীতি ছাড়া আমি অন্য সব কিছুর সমর্থক। মাও-সে-তুঙ সম্পর্কে তার মন্তব্য ধর্মহীনতা ছাড়া তার সব নীতির আমি সমর্থন করি। কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো ও ভিয়েতনামের হো চি মিনকে তিনি শ্রদ্ধা করতেন। চীনের অর্থনীতি কর্মসূচির সমর্থক ছিলেন। চীনের সান ইয়াৎ সেনের সাথে তার অনেকখানি নৈকট্য খুঁজে পাওয়া যায়। সান ইয়াৎ সমাজতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ একজন বিপ্লবী নেতা ছিলেন। সবসময় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত না থেকেও সান ইয়াৎ যেমন চীনে জাতীয়তাবাদী ও সমাজবাদের জাগরণ আনেন তেমনি মওলানা ভাসানীও বৃটিশ ভারতে বাংলা, আসাম, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক এবং সমাজতান্ত্রিক চেতনাকে জনপ্রিয় করে তোলেন। কোনো ইস্যুতে জনমত সৃষ্টিতে তার অপার দক্ষতা। সামাজিক ও রাজনৈতিক অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে অতি অল্প সময়ের মধ্যে জনগণকে উত্তেজিত করে তুলতে পারতেন, মানুষের আবেগকে উত্তেজনায় পরিণত করতে পারতেন। গ্রামীণ কৃষক-কুমার-মজুর-তাঁতীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে তাদের দুঃখের স্থানটি সনাক্ত করতেন, তাদের চেতনার মান বাড়িয়েছেন। উপমহাদেশের মধ্যবিত্ত নির্ভর রাজনীতিতে তিনি গ্রামের মানুষের অংশগ্রহণ অপরিহার্য করে তোলেন। তিনি আন্দোলনের নতুন নামকরণ করতেন। প্রশাসন জনসভা স্থলে ১৪৪ ধারা জারি করলে তিনি সমর্থকদের নিয়ে নৌকায় নদীতে জনসভা করেছেন। কারণ নদীতে ১৪৪ ধারা বলবৎ থাকত না। তিনি মিছিল নিয়ে বের হলে পুলিশ বাঁধা দিলে নামাজের সময় হলে সমর্থকদের নিয়ে নামাজ আদায় করতেন। হরতাল, অনশন, ঘেরাও ইত্যাদির পাশাপাশি তিনি ফারাক্কা অভিমূখে লংমার্চের কর্মসূচি পালন করেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে লংমার্চের কর্মসূচি প্রথম। কলকাতার হলদিয়া সমুদ্র বন্দরের নাব্যতা ভারত সরকার আন্তর্জাতিক নদী গঙ্গায় বাঁধ দিয়ে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশের পরিবেশ ও অর্থনীতিতে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। একে একে শুকিয়ে যেতে থাকে পদ্মা ও শাখা নদীগুলো। ফারাক্কার এই বিপর্যের দিকটি হৃদয় দিয়ে অনুধাবন করেছিলেন মওলানা ভাসানী। তিনি এই বাঁধের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জনমত গঠনের লক্ষে লংমার্চের আয়োজন করেছিলেন। যা আজও ফারাক্কা লং মার্চ নামে পরিচিত। বৃটিশ শাসিত ভারত থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তানের ২৪ বছর এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পাঁচ বছর তিনি সত্যের জন্য, শোষিতের পক্ষে, জমিদার, সুদখোর মহাজন, আইয়ুব, মোনায়েম, ইয়াহিয়াসহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে তার বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অবসান হয় ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর। তার মৃত্যুর পর দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদকীয় শিরোনামে শতাব্দির সূর্য অস্তমিত হইল, দৈনিক বার্তা বিশেষ সম্পাদকীয়তে চির অম্লান তার স্মৃতি, দৈনিক বাংলা রাজনৈতিক গগনের জ্যোতিম্লান নক্ষত্র, দৈনিক সংবাদ সম্পাদকীয়তে শতাব্দির গৌরব রবি আজ অস্তমিত, বাংলাদেশ টাইমস Demise of a Titan ইত্যাদি বলে তার সংগ্রামী জীবনকে আখ্যায়িত করেন। তার সংগ্রামী জীবনের স্মৃতি অম্লান হয়ে থাকবে এ দেশের লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয়ে।

 

 

বার পঠিত

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ




সমাজ ও গ্রন্থাগার

সমাজ ও গ্রন্থাগার

০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০০:০০


জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

১০ জানুয়ারী, ২০১৮ ০০:২৩

এই ছবিটি যেন ‘বিরল’ হয়ে না থাকে

এই ছবিটি যেন ‘বিরল’ হয়ে না থাকে

২১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০







ব্রেকিং নিউজ





এবার যশোরে ব্রাজিল বাড়ি 

এবার যশোরে ব্রাজিল বাড়ি 

২১ জুন, ২০১৮ ০১:০৯

বিশ্বকাপে আজকের খেলা 

বিশ্বকাপে আজকের খেলা 

২১ জুন, ২০১৮ ০১:১৩