খুলনা | শুক্রবার | ১৭ অগাস্ট ২০১৮ | ২ ভাদ্র ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor
দিলীপ পাল

খুলনার সংবাদপত্রের সেকাল-একাল

দিলীপ পাল | প্রকাশিত ৩১ জানুয়ারী, ২০১৭ ০০:৫৮:০০

খুলনার সংবাদপত্রের সেকাল-একাল

স্বাধীনতাত্তোর ১৯৭২ সালে খুলনা থেকে কোন দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হতো না। সেকালে খুলনা থেকে কয়েকটি সাপ্তাহিক প্রকাশিত হতো। পত্রিকাগুলো হলো সাপ্তাহিক জনবার্তা, সাপ্তাহিক পূর্বাঞ্চল, সাপ্তাহিক জন্মভূমি, সাপ্তাহিক ছায়াপথ, সাপ্তাহিক কালান্তর। পরবর্তীতে সাপ্তাহিক জনবার্তা দৈনিক জনবার্তা হিসেবে প্রথম খুলনায় প্রকাশ করে। তার কিছুদিনের মধ্যে সাপ্তাহিক পূর্বাঞ্চল দৈনিক পূর্বাঞ্চল হিসেবে প্রকাশ করে। সে সময়ে বর্তমান সময়ের মতো আধুনিক প্রযুক্তির কথা তখন চিন্তা করা যেত না। সেকালে সীসার টাইপ হাতে সাজিয়ে এবং ফ্লাট মেশিনে ছাপা হতো। পত্রিকায় ছবি ছাপাতে হলে জিঙ্ক দ্বারা ব্লক তৈরি করে তবে ছাপাতে হতো।
পরবর্তীতে আশির দশকে দৈনিক পত্রিকার সংখ্যা বেড়ে যায়। এ সময় দৈনিক জনবার্তা, দৈনিক পূর্বাঞ্চল, দৈনিক অনির্বাণ, দৈনিক প্রবাহ, দৈনিক গণদেশ, দৈনিক প্রবাসী, দৈনিক জন্মভূমি, দি ডেইলী ট্রিবিউন,   দৈনিক বিশ্বডাক, দি মুসলিম ওয়ার্ল্ড নিয়মিত প্রকাশিত হতো। এছাড়াও সাপ্তাহিক পত্রিকা ছিল জেলা পরিষদ থেকে সাপ্তাহিক খুলনা, সাপ্তাহিক জনভেরী, সাপ্তাহিক ছায়াপথ ও সাপ্তাহিক কালান্তর। তখন পত্রিকার  সার্কুলেশন তেমন ছিল না। এখনকার মত দ্রুত নিউজ কভার করাও তখন সম্ভব হতো না। খুলনা নিউজপ্রিন্ট থেকে তৈরি নিউজপ্রিন্ট কাগজ দ্বারাই পত্রিকা ছাপা হতো। সম্পাদকরা খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল থেকে কাগজের কোটা পেতেন।  
১৯৮২ সালে সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহের জন্য একালের মত ই-মেইল, মোবাইল বা কোন নিউজ এজেন্সি ছিল না। সাংবাদিকদের শহরের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে নিউজ সংগ্রহ করতে হতো। বড় কোন রাজনৈতিক দলের নেতারা খুলনা সার্কিট ময়দানে জনসভা করতে এলে সংবাদকর্মীদের সেখানে যেয়ে তাদের বক্তব্য শুনে তথ্য যোগাড় করতে হতো। সন্ধ্যায় পত্রিকা অফিসে গিয়ে একগাদা কাগজ নিয়ে ডেস্কে নিউজ লিখতে বসতে হতো। লেখা শেষ করে নিউজটি বার্তা সম্পাদক অথবা চীফ রিপোর্টারের কাছে দিতেন। তারা নিউজটি এডিট করে কম্পোজ করতে দিতেন। খুলনা স্টেডিয়ামে কোন খেলা হলে ক্রীড়া সাংবাদিককে গ্যালারিতে বসে খেলা দেখে নিউজ তৈরি করতে হতো। এছাড়াও বিশ্বকাপ ক্রিকেট ও বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার নিউজ টিভির সামনে বসে খেলা দেখে তৈরি করতেন। বর্তমান সময়ের চেয়ে তখনকার দিনে সাংবাদিকরা সকাল থেকে অর্ধ রাত পর্যন্ত পরিশ্রম করতেন। তবে পরিশ্রমের ন্যায্য মজুরী তারা পেতেন না। এ সময়ে এসব দৈনিক পত্রিকায় সাংবাদিক ছিলেন আনোয়ার আহমেদ, শেখ দিদারুল আলম, আব্দুল্লাহ আল-মামুন, কাজী মোতাহার রহমান, কাদের খান, কামাল মাহমুদ, ওয়াদুদুর রহমান পান্না, প্রয়াত রফিকুজ্জামান, প্রয়াত হরেকৃষ্ণ ভোলা, অমিয় পাল, এম হেফজুর রহমান, গৌরাঙ্গ নন্দী, শেখ আবু হাসান, জ্যোর্তিময় মল্লিক,  আব্দুল হালিম, এস, এম হাবিব, শেখ আতিয়ার রহমান, কাজী আমানুল্লাহ, অরুণ সাহা প্রমুখ।
সকাল ৯টা থেকে ভেতরের দুই ও তিন পাতার কাজ শুরু হতো। কম্পোজিটররা কম্পোজ করে যেতেন। দুপুর ২টার পর পিয়ন প্র“ফ তুলে রাখতেন, প্র“ফ রিডার লাল কালি দিয়ে কারেকশন করতেন। কারেকশনম্যান সেই ভুল গুলো টাইপ পাল্টিয়ে ঠিক করতাম। পরবর্তীতে মেকআপ ম্যান পেজ মেকআপ দিতেন। সন্ধ্যায় মেশিন ম্যান ভিতরের দুই পাতা ছাপাতেন। সন্ধ্যার সাথে সাথে প্রথম পাতা ও শেষ পাতার কাজের জন্য কম্পোজিটররা অফিসে প্রবেশ করতো। মেশিনম্যান ভেতরের পাতা ছাপা হলে সেই পেজ ভেঙ্গে ডিস্টিবিউ করে নতুন করে আবার কম্পোজ করতেন। এভাবে ভাঙ্গা গড়ার মধ্য দিয়ে ভোর রাতে প্রকাশিত হতো পত্রিকা। সীসার টাইপও ছোট বড় ছিল। ১২ পয়েন্ট পাইকা টাইক দিয়ে নিউজের বডি কম্পোজ হতো। ১২ পয়েন্ট পাইকা বোল্ড, ১৮ পয়েন্ট, ২৪ পয়েন্ট, ৩৬ পয়েন্ট, ৪৮ পয়েন্ট, ৬০ পয়েন্ট দিয়ে হেডিং করতেন। গুরুত্বপূর্ণ নিউজ হলে ১ দেড় ইঞ্চি কাঠের টাইপ হেডিং-এ ব্যবহার হতো।
১৯৮৫ সালে দৈনিক পূর্বাঞ্চলের সম্পাদক মরহুম আলহাজ্ব লিয়াকত আলী আধুনিক প্রযুক্তিতে পত্রিকা বের করার উদ্যোগ নেন। পত্রিকাটি লেটার কম্পোজ হলেও ছাপা হতো অফসেট মেশিনে। সেলুপিন পেপারে ফ্লাট মেশিনে এক কপি ছাপিয়ে ফাউডার লাগিয়ে দিতেন। পরবর্তীতে আমাদের মরহুম সাংবাদিক মহবুব ভাই ইলাস্ট্রেশন করে প্লেট করতে দিতেন। তখন স্ক্যানিং মেশিন ছিল না। ফটো সাংবাদিকরা ছবি তুলে সাদা-কালো ছবি করে পজেটিভ করতেন। সেই পজেটিভ পত্রিকার পাতায় সেট করে ছবি ছাপানো হতো। দিনে দিনে পূর্বাঞ্চলের সার্কুলেশন বেড়ে গেল। সবাই ভাল ছাপা পত্রিকা পড়তে আগ্রহী হলো। এভাবে চলে গেল কয়েক বছর। ১৯৮৯ সালে লিয়াকত আলী সাহেব প্রথম কম্পিউটার খুলনায় আনলেন। প্রথমে তিনি দি ডেইলী ট্রিবিউন পত্রিকা কম্পিউটারে কম্পোজ করে অফসেট মেশিনে বের করলেন। কয়েকদিন পর দৈনিক পূর্বাঞ্চল কম্পিউটারে প্রকাশিত হতে লাগল। তখন ট্রিবিউন ও পূর্বাঞ্চল দুই পত্রিকায় প্রায় ৪০ জন কম্পোজিটর কাজ করতেন। কম্পিউটার আসার পর প্রায় ৩০ জনই চাকুরি হারালেন। পত্রিকার সম্পাদকরা তাদের কোন ক্ষতিপূরণ দেয়নি।
শুধু পত্রিকা নয় ছাপাখানাও কম্পিউটার ও অফসেট মেশিন আসায় অনেক পুরানো শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ে। ৩০/৩৫ বছর ছাপার জগতে চাকুরি করে অবশেষে আধুনিক প্রযুক্তির কাছে তারা হার মানতে বাধ্য হয়। অতএব, পুরানো বন্ধুদের সঙ্গে এক সাথে কাজ করা আর সম্ভব হয়নি।
উল্লেখিত আঞ্চলিক দৈনিক পত্রিকাগুলো খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, পীর খানজাহান (রঃ) সেতু নির্মাণের দাবিতে আন্দোলন, ৯০ এর স্বৈরাচারী বিরোধী আন্দোলন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও পেশাজীবীদের সংবাদ প্রকাশ করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
১৯৯২ সালে বর্তমান প্রেসক্লাব সভাপতি এস, এম নজরুল ইসলাম সাড়ম্বরে বের করেন দৈনিক তথ্য পত্রিকা। শেখ আবু হাসান ভাই ছিলেন পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক। গৌরাঙ্গ নন্দী ছিলেন বার্তা সম্পাদক। সাংবাদিক ছিলেন আব্দুল হালিম, এস এম হাবিব, আব্দুল কাইয়ুম, বাদল, আশেক ইলাহী, আবু তৈয়ব, মাসুদুর রহমান রানা, এড. ফরিদ আহমেদ,  লু.র জাহাঙ্গীর, শাহ আলম, মুকু ভাইসহ অনেকেই। সাদা-কালো কম্পিউটার কম্পোজ অফসেট মেশিনে ছাপা পত্রিকাটি বের হয়। অল্প দিনে এতদাঞ্চলের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। পরবর্তীতে দৈনিক পূর্বাঞ্চল ৪ কালারে প্রকাশিত হতে লাগল। ২০০৮ সালে এস, এম নজরুল ইসলাম দৈনিক তথ্য পত্রিকাটি সরোয়ার খানের নিকট মালিকানা হস্তান্তর করেন।
খুলনায় বিভিন্ন সময় দৈনিক পাঠকের কাগজ, দৈনিক সেবক, দৈনিক গণদেশ, দৈনিক বঙ্গবাণী, দৈনিক সদ্য খবর, দৈনিক ফলাফল,  দৈনিক বিশ্বডাক, দি ডেইলী মেইল, দি মুসলিম ওয়ার্ল্ড, দৈনিক প্রবাসী বের করলেও অবশেষে এসব পত্রিকাগুলো বন্ধ হয়ে যায়।
বর্তমানে খুলনা থেকে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো হচ্ছে দৈনিক পূর্বাঞ্চল, দৈনিক সময়ের খবর, দৈনিক প্রবাহ, দৈনিক জন্মভূমি, দৈনিক প্রবর্তন, দৈনিক অনির্বাণ, দৈনিক তথ্য, দৈনিক আলোকিত খবর ও দৈনিক খুলনাঞ্চল।  
২০১০ সালে ৩ জুলাই খুলনায় প্রকাশিত হয় দৈনিক সময়ের খবর। প্রথম থেকেই পত্রিকাটি কম্পিউটার কম্পোজ ও পেজ মেকারে ৪ কালারে বের হয়। পত্রিকাটি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ করে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনসহ সর্বমহলে গ্রহণ যোগ্যতা অর্জন করেছে। দৈনিক সময়ের খবরের ৭ম বছরে পদার্পণ করেছে। শত ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করে ৬টি বছর পার করেছে। সবশেষে ৭ম বছরে পদার্পণ করায় দৈনিক সময়ের খবর পত্রিকা পরিবারের সবাইকে জানাই শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। পত্রিকাটি কারো পাঠপ্রিয় হোক এ প্রত্যাশা করি।

 

বার পঠিত

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বঙ্গবন্ধুই আমার প্রেরণা 

বঙ্গবন্ধুই আমার প্রেরণা 

১৫ অগাস্ট, ২০১৮ ০০:৫০







সমাজ ও গ্রন্থাগার

সমাজ ও গ্রন্থাগার

০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০০:০০


জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

১০ জানুয়ারী, ২০১৮ ০০:২৩

এই ছবিটি যেন ‘বিরল’ হয়ে না থাকে

এই ছবিটি যেন ‘বিরল’ হয়ে না থাকে

২১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ব্রেকিং নিউজ











ফাইনালে বাংলাদেশের মেয়েরা

ফাইনালে বাংলাদেশের মেয়েরা

১৭ অগাস্ট, ২০১৮ ০১:০২