খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২১ জুন ২০১৮ | ৭ আষাঢ় ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

‘বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, কাজ কর সময় আসলে সব হবে’

মেয়র নির্বাচনের ইচ্ছে নেই, নতুনদের স্থান দিতে চাই : তালুকদার আব্দুল খালেক

এম এ কবির মুন্সী | প্রকাশিত ২৯ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:৩৬:০০

“১৯৬৯/৭০ সালে জেল থেকে মুক্তির পর খুলনায় আসেন বঙ্গবন্ধু। রূপসা ঘাটে এসে নামেন। আমরা খুলনার স্থানীয় ছাত্রনেতারা সেখানে বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানাতে যাই। আমাদের প্রায় সকলের সাথে কথা বলেছিলেন তিনি। আমরা তখন শ্লোগান দিচ্ছিলাম, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশকে স্বাধীন কর’। সেই সময় বঙ্গবন্ধু আমায় কাছে ডেকে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন, কাজ কর সময় আসলে সব হবে।” এভাবেই কৈশোরের স্মৃতিচারণ করেন বাগেরহাট-৩ (রামপাল-মংলা) আসনের একাধিক বার নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও খুলনা নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক। তিনি বলেন, “বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখেছি। তার আদর্শের রাজনীতি করছি। আমার জীবনে আর কোন চাওয়া পাওয়া নেই। বঙ্গবন্ধু কিছু দিতে না পারলেও তার আদর্শে মানুষ হয়েছি। আর তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে সব দিয়েছেন। আমি কমিশনার, মেয়র, এমপি, মন্ত্রী সব হয়েছি। জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে যে যে আসনে বসিয়েছেন আমি অন্তর দিয়ে কাজ করেছি। কোন খাদ রাখিনি। তবে মহান নেতা বঙ্গবন্ধুকে খুব মনে পড়ে।”
খুলনা অঞ্চলের রাজনীতির অন্যতম স্তম্ভ তালুকদার আব্দুল খালেক ১৯৫২ সালের ১ জুন বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার মল্লিকের বেড় গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তিনি বুঝতে শেখার আগেই মাত্র চার বছর বয়সে মারা যান পিতা আইয়ুব আলী তালুকদার। মাতা উম্মে কুলসুম ছিলেন গৃহিনী। দুই ভাই এক বোন। ভাইদের মধ্যে তিনি সবার বড়। তার স্ত্রী সাবেক সংসদ সদস্য বেগম হাবিবুন্নাহার।
বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী বর্ষিয়ান এ নেতা তার কৈশোরের স্মৃতিচারণে বলেন, “বাবা মারা যাবার পর আমাকে নিয়ে মায়ের সকল স্বপ্ন যেন বিলীন হয়ে যায়। তখন মায়ের কোন স্বপ্ন ছিল না, তবে লক্ষ্য ছিল একটাই যে ছেলে লেখা-পড়া শিখবে। যখন থেকে বুঝতে শুরু করেছি, তখন থেকে আমার মনের বাসনা ছিল রাজনীতি করব। রাজনীতি করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করব। দেশের জনগনের জন্য কাজ করব। জজ-ব্যারিস্টার, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হবার কোন স্বপ্ন ছিল না।” তিনি বলেন “ছাত্রজীবন শুরু করি রামপালের খাসিরডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। দুরন্ত দুষ্টু হওয়ার কারনে সে সময় ৫-৬ বার স্কুল পরিবর্তন করতে হয়েছিল। প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে ভর্তি হই খুলনা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। এখানে স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে বর্তমান সরকারি বিএল কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করি। এরপর মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজ থেকে ১৯৭৪ সালে গ্রাজুয়েশন করার পর শিক্ষা জীবন শেষ করি”। তবে বর্তমানে রাজনীতির ভিড়ে মন থেকে হারিয়ে ফেলেছি ছোট্টবেলার সেই দুষ্টুমির স্মৃতিগুলো। বাবার স্মৃতিচারণে তিনি বলেন, “ছোট্টবেলা স্কুল পালানো বা দুষ্টুমির স্মৃতিগুলো হারিয়ে গেছে আমার জীবন থেকে। মাত্র ৪ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর কারনে সেই মিষ্টি শাসনের কথা এখন আর মনে নেই। মা গ্রামে থাকতেন, আর আমি ভগ্নিপতির কাছে থেকে লেখা-পড়া করেছি। ফলে মায়ের শাসনও হারিয়ে ছিলাম আমার জীবন থেকে। তবে বাবা-মায়ের শাসন না পেলেও জনগনের জন্য কাজ করতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনৈতিক জীবন গড়তে পারা আমার জীবনে পরম পাওয়া”।
রাজনৈতিক জীবনের বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “১৯৬৮ সালে আমি খুলনা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। তখন সারাদেশে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা আর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নিয়ে আন্দোলন চলছে। এ সকল আন্দোলন আমাকে রাজনীতিতে আসায় উদ্বুদ্ধ করে। সেই থেকে রাজনীতি শুরু আমার।” তিনি বলেন “আমি আমার ভগ্নিপতি এড. ইলিয়াসের বাসায় থেকে পড়ালেখা করতাম। ভগ্নিপতি তখন ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন। ভগ্নিপতি যেহেতু রাজনীতিবিদ, সেই সুবাদে ভগ্নিপতির রাজনৈতিক কর্মসূচি দেখে আমার রাজনীতিতে আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। তার অনুপ্রেরণায় খুলনা মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আহবায়ক নির্বাচিত হই। এরপর ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে সিটি কলেজ সংসদ নির্বাচন হয়। যে নির্বাচনে শেখ শহীদ ভিপি, হেকমত আলী ভূঁইয়া সাধারণ সম্পাদক আর আমি হয়েছিলাম এজিএস। এরপর ১৯৭০ এর নির্বাচনে আমরা নৌকা প্রতীক নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বিজয়ী করতে কাজ করি এবং সেই নির্বাচনে খুলনায় আমি বড় ভূমিকা রাখি। বঙ্গবন্ধু নির্বাচনে জয়লাভও করেন। এরপর ১৯৭৩ সালে খুলনা জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। তখন বঙ্গবন্ধু দেশের প্রধানমন্ত্রী। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে যখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়, তখন আমাদের উপর নেমে আসে নানা জুলুম-অত্যাচার। সেখান থেকে আস্তে আস্তে আবার আমরা দল গোছাতে থাকি। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান পৌরসভার নির্বাচন দেন। সেই নির্বাচনে মহসিনাবাদ ইউনিয়নে কমিশনার প্রার্থী হই। এখন যেটা দুই ভাগে বিভক্ত ২২ ও ২৯নং ওয়ার্ড। এখান থেকে নির্বাচন করে আমি জীবনে প্রথম জয়লাভ করি। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত আমি ছিলাম এখানে প্রথম নির্বাচিত কমিশনার। এরপর মহসিনাবাদ ইউনিয়ন আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। আর রাজনীতিতে পিছে ফিরে তাকাতে হয়নি এবং বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন বাস্তবায়নে আজও কাজ করে যাচ্ছি” বলেন এ নেতা।
রাজনৈতিক জীবনে এ নেতার লক্ষ্য ছিল একটাই, বঙ্গবন্ধু যে লক্ষ্য উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনীতি করেছেন, তা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করা আর এই মহান নেতা স্বপ্ন পূরণ করা। আর এ স্বপ্ন পূরনে তার পরিবার সব সময় সাথে থেকেছেন। তিনি বলেন, “আমার পরিবারটা একটা আওয়ামী লীগ পরিবার, যেখানে দলের বাইরে কেউ কোন চিন্তা ভাবনা করে না।”
নিজের জীবন সম্পর্কে তিনি বলেন, “দুঃখের কোন স্মৃতি নেই। কারণ সব কিছুকেই জয় করেছি। যখন যে দায়িত্ব পেয়েছি বা জনগণ দিয়েছেন, তখন সেই দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করেছি। কোন বাধা বা কোন কষ্ট আমার রাজনীতির জীবনে ডানা মেলতে পারেনি।” জীবনে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করা এই নেতা জানান, “মানুষের উপকার করার পর সেই অসহায় মানুষটা যখন আবার ধন্যবাদ জানাতে আসে তখন সেই মুখটা দেখলে পরানটা জুড়িয়ে যায়। জনগণই আমার পরম আপন।” আক্ষেপ করে এ নেতা বলেন, “রাজনৈতিক জীবনে একটাই কষ্ট যে আমি রাজনীতিতে যাদের উপকার করেছি, যাদের উপরে উঠিয়েছি তারাই পরবর্তীতে আমার ক্ষতি করেছে।”
তবে এ রাজনীতিবিদ বলেন, “ছাত্র জীবনটা বেশি আনন্দের ছিল আমার। ফুটবল, র‌্যাকেট খেলতে পছন্দ করতাম। আর সব থেকে প্রিয় খুলনা জিলা স্কুলের মাঠে খেলতে ভালোবাসতাম।” সাদা রংটা এই নেতার খুব প্রিয়। পরতে পছন্দ করেন পায়জামা পাঞ্জাবী, প্রিয় খেলা আগে ফুটবল হলেও বর্তমানে ক্রিকেট। খেতে পছন্দ করেন সাদা ভাত সাথে যদি হয় ছোট মাছ, কৈ বা ইলিশ তবে তো কথাই নেই। দাওয়াত খাওয়া মোটেই পছন্দের নয় এই নেতার। বলেন, “দাওয়াতে গেলেতো আমার সাথে আরও ২০-৫০ জন বেশি যায়। এতে করে যে দাওয়াত দেবে তার সামর্থ নাও থাকতে পারে। এজন্য হিসাব করে দাওয়াত খেতে যাই।”
“অবসর বলতে এই নেতার জীবনে কিছুই নেই। তিনি বলেন প্রতিদিন রাতের ঘুম শেষে ভোর হলেই বাইরে অপেক্ষমান জনমানুষের সাথে কথা বলে বাসা থেকে বের হই। এরপর নিজ নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে কাজ করি। সেখানের কাজ শেষে শহরে ফিরে খুলনার স্থানীয় অনুষ্ঠানে যোগদান করি। গভীর রাতে বাড়িতে ফিরে আবার অপেক্ষমান জনগনের সাথে কথা বলি। যতক্ষণ ঘুমে থাকি ততক্ষণ আমার অবসর সময় বললেন এ জনপ্রতিনিধি।  
খুলনাকে কেমন দেখতে চান জানতে চাইলে এ নেতা বলেন, “খুলনার উপর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দরদ আছে। আমি খুলনাকে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি। আমি খুলনার মেয়র থাকাকালে খুলনার জনগনের জন্য কি কি করেছি আর কি কি করতে চেয়েছি বা কেমন খুলনা হিসেবে দেখতে চেয়েছিলাম তার বিবেচনা শুধু আওয়ামী লীগ নয়, খুলনার জনগণ করবেন। খুলনার জনগণ বিবেচনা করলে খুলনায় আগে কি ছিল, কি ছিল না, এতটুকু ভাবলেই সব পেয়ে যাবেন। সর্বোপরি আমি চাই মেয়র হিসেবে একজন যোগ্য প্রার্থী। যে খুলনা শহরে আমার অসম্পূর্ণ কাজগুলো করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রীর থেকে টাকা এনে কাজ করতে পারবে। যাতে করে খুলনার উন্নয়ন হয়।”
সাবেক এ মেয়র বলেন, “আমার দলের অনেক যোগ্য প্রার্থী তৈরি হয়েছে। তাদের স্থান দেওয়া দরকার। অপরদিকে আমাকে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন করতে হলে আমার নির্বাচনী আসন থেকে পদত্যাগ করতে হবে। সুতরাং সব যদি একা আমি দখল করি তবে নতুনরা কি করবে। আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে অংশ নেয়া। তবে যেহেতু আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করি। সুতরাং জননেত্রী শেখ হাসিনা যদি দলের স্বার্থে আমাকে নির্বাচন করতে বলেন তবে তার কথায় আমি সব ছাড়তে পারি। সব করতে পরি।”
নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে খুলনা মহানগর আ’লীগের সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, “রাজনীতি করতে হলে প্রথমে একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, তা হচ্ছে ক্ষমতা হাতে পেয়ে যেন জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্র“তি ভুলে না যাই। জনগণ বা নেতা-কর্মীকে যা দিতে পারব, তার বেশি যেন বানিয়ে না বলি। আমার চলাফেরা রাজনৈতিক কর্মকান্ড দেখে যদি কেউ তার রাজনীতিতে সফলতা আনতে পারে এটাই আমার সাফল্য। আর যদি কেউ মনে করে আমার সাথে থেকে নিজের ভাগ্য গড়বে এটা আমি পছন্দ করি না। বুঝতে পারলে আমি নিজে তার থেকে দূরে সরে যাই।”
সর্বশেষ সময়ের খবর কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন “এ প্রতিবেদনের মাধ্যমে আমাদের সম্পর্কে অজানা অনেক তথ্য ও চাওয়া-পাওয়া সম্পর্কে জানতে পারবে নেতা-কর্মীরা। সে যে নেতার সাথে চলুক না কেন তার জীবন সম্পর্কে জানার পাশাপাশি সেই আদর্শে চলতে পারবে।”

 

বার পঠিত

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ





এবার যশোরে ব্রাজিল বাড়ি 

এবার যশোরে ব্রাজিল বাড়ি 

২১ জুন, ২০১৮ ০১:০৯

বিশ্বকাপে আজকের খেলা 

বিশ্বকাপে আজকের খেলা 

২১ জুন, ২০১৮ ০১:১৩