খুলনা | সোমবার | ১১ ডিসেম্বর ২০১৭ | ২৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪ |

Shomoyer Khobor

নকল ওষুধের আতঙ্ক কাটছেই না খুলনার বাজারে!

সোহাগ দেওয়ান | প্রকাশিত ২৩ নভেম্বর, ২০১৭ ০২:০০:০০

খুলনার বাজার থেকে কাটছেই না নকল ওষুধের আতঙ্ক। র‌্যাব, জেলা প্রশাসন, ওষুধ প্রশাসন ও পুলিশের শত চেষ্টার পরেও নিয়ন্ত্রণহীন নকল ওষুধ ব্যবসা। বিনিয়োগের চাইতে ৪০-৫০ গুণ বেশি লাভ হওয়ায় নকল ওষুধের ব্যবসায় ঝুঁকে পড়ছে অনেকে। কোন কোন ক্ষেত্রে শোনা যাচ্ছে “মাদক ও নকল ওষুধের ব্যবসায় বেশি মুনাফা” এ কারনেই মুলতঃ এ ব্যবসায় নেমেছে চক্রটি।
বিভিন্ন সময় নকল ওষুধ ব্যবসার সাথে জড়িতদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করে মামলা দায়ের ও আদালতে সোপর্দ করে থাকে কিন্তু আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসেন তারা। এরপর আবারো নকল ওষুধের ব্যবসার সাথে সংযুক্ত হয় তারা। একই চিত্র দেখা যায় মাদক ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে। খুলনার সাধারণ ভোক্তারা বর্তমানে ফার্মেসীতে ওষুধ কিনতে গেলেই আসল-নকলের আতঙ্কে ভুগছেন। অসুস্থ প্রিয় স্বজনের জন্য আসল ওষুধ পাওয়ার জন্য অনেক সময় দোকানদার (ফার্মাসিস্ট)-দের হাতজোড় করে অনুরোধ করেন ক্রেতারা।
গত দেড় বছরে খুলনায় প্রশাসনের অভিযানে নকল ওষুধসহ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী ও জড়িতরা গ্রেফতার হয়। পাশাপাশি নকল ওষুধ তৈরির কারখানা ও বিপুল পরিমাণ জব্দও করা হয়। এছাড়া সরকারি হাসপাতালের ওষুধ ও অননুমোদিত ভারতীয় ওষুধ জব্দসহ আসামিদের গ্রেফতার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মামলার মাধ্যমে আইনগত ব্যবস্থা নিলেও তারা কালো টাকার জোরে বেরিয়ে আসেন।    
গত ২০ নভেম্বর গভীর রাতে নগরীর সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় যৌন উত্তেজক ট্যাবলেট, নেশার ইনজেকশন ও নকল ওষুধসহ মোঃ আরাফাত হোসেন (৩০) নামের একজন চোরাকারবারীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫-বি ধারায় সোনাডাঙ্গা থানায় মামলাও দায়ের করা হয় (নং-৩২)। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে ইতোমধ্যে আদালতে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে।
থানার ওসি মমতাজুল হক জানিয়েছেন, সোনাডাঙ্গা আবাসিক এলাকায় ২য় ফেজের ৬ নম্বর রোডের ১১/২ নম্বর সম্প্রীতি বাড়ির একটি ফ্লাটে অভিযান চালিয়ে এ সকল ওষুধসহ একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।  প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার মোঃ আরাফাত এ চোরাচালানের সাথে জড়িত ২/৩ জনের নাম বলেছে। ৫১, নাজিরঘাট মেইন রোড এলাকার মোঃ আমজাদ হোসেনের ছেলে। জব্দ ওষুধের তালিকায় রয়েছে ভারতের গুজরাটের আয়ুস’র লোগোযুক্ত ভেগ ক্যাপস্যুল, মুম্বাইয়ের এডরেনর ইনজেকশন, আহমেদাবাদ লেখা (কে-বিআইএনডি) পাউডার, হিন্দি ও ইংরেজি লেখা এন-সিআইপি ট্যাবলেট, ইন্ডিয়া লেখা হেপারিন জেলি, ভারতের পারাকটিয়া নামের ওষুধ ও নেশার ইনজেকশন।  
ওসি মমতাজুল হক আরও জানান, এ সকল ওষুধ খুলনার বিভিন্ন ফার্মাসী ও বেসরকারি ক্লিনিক-হাসপাতালে সাপ্লাই দেয়া হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
গত ২১ নভেম্বর হেরাজ মার্কেটে জেলা প্রশাসন, র‌্যাব-৬ ও ওষুধ প্রশাসনের শুরু হওয়া যৌথ অভিযানে নকল ওষুধের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল অভিযান হয়েছে, আজও চলবে।
একটি বেসরকারি সংস্থার পরিসংখ্যানে জানা গেছে, দেশে এখন রোগ নিরাময়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ওষুধ ভেজালে আক্রান্ত। নকল ও মানহীন ওষুধে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। বাজারে থাকা ২৭ হাজার ব্র্যান্ডের মধ্যে কোনো ধরনের গুণগতমান পরীক্ষা ছাড়াই ১৪ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ বাজারে রয়েছে। যেসব কোম্পানি রয়েছে, সেগুলোর উৎপাদিত ওষুধের শতকরা ৭০ ভাগের মান পরীক্ষা ছাড়াই বাজারজাত করা হচ্ছে। কোম্পানিগুলো তাদের নিজস্ব ল্যাবে কোনোরকমে মান পরীক্ষা করে বাজারজাত করছে। প্রায়ই এসব কারখানার সন্ধান পায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব কারখানার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা কতটা নেয়া হয়, তা অনেকটা অজানাই থেকে যায়। প্রভাব-প্রতিপত্তি ও আইনের দুর্বলতার কারণে, সেসব কারখানা পুনরায় নকল ওষুধ উৎপাদন শুরু করে। শুধু তাই নয়, অনুমোদনহীন অসংখ্য ফার্মেসিও চালু রয়েছে। নকল ওষুধ বাজারজাতকরণে এসব ফার্মেসির ভূমিকা রয়েছে। তারাই মানহীন ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদনকারী কোম্পানির ওষুধ খেতে রোগীদের প্ররোচিত করে। ভেজাল ও মানহীন ওষুধের দৌরাত্মে মানুষের জীবনই বিপন্নের আশঙ্কার মধ্যে পড়েছে।
উল্লেখ্য, বিভিন্ন সময় নগরীর হেরাজ মার্কেটে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ওষুধ প্রশাসনের অভিযানে নকল ওষুধ উদ্ধার করা হয়। গত বছরের ১০ অক্টোবর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব-১ ও র‌্যাব-৬ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে রূপসা থানাধীন জাবুসা চর রূপসায় অবস্থিত মেসার্স শাহনেওয়াজ সী ফুড প্রাইভেট লিঃ-এর ভিতরে নকল ওষুধ তৈরির কারখানার সন্ধান অভিযান চালায়। এ সময় কারখানাটি থেকে এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালস্’র ফ্লুক্লক্স ক্যাপসুল ২ হাজার ৬শ’ পিস, আড়াই লাখ খালি খোসা ও পাউডার, কাটুন ফ্লুক্লক্স ৫০০ গ্রাম পাঁচ বস্তা, অপসোনিন ফার্মাসিউটিক্যালস্’র রেনিডিট ১৫০ গ্রাম ১ বস্তা, ট্যাবলেট কনপ্রেরেট ৪ হাজার পিস, এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস্’র ফয়েল ফ্লুক্লক্স ৫০০ গ্রাম আড়াই কেজি, প্রিন্স ফার্মাসিউটিক্যালস্ এন্ড হার্বাল ইন্ডাস্ট্রিজের টেস্টি স্যালাইনসহ ৩ লাখ ৫০ হাজার ক্যাপসুলের খালি খোসা ও বিভিন্ন ওষুধ তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করেন। এ ঘটনায় ১১ অক্টোবর সিপিসি সদর, র‌্যাব-৬’র ডিএডি মোঃ নাজমুল হুদা বাদী হয়ে ১৯৭৪ সনের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫-গ (১) (গ) ধারায় রূপসা থানায় কাজী শাহ নেওয়াজসহ চার জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১২/১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন (যার নং-০৪)। মামলার এজাহারভুক্ত অপর আসামিরা হলেন ঢাকার ৭৩, শান্তিবাগ মসজিদ রোডের বাসিন্দা মৃত সাইফল্লাহ’র ছেলে মোঃ জাকির হোসেন (৪৮), খুলনার বাগমারা পূর্ব রূপসা এলাকার মোঃ আনোয়ার হোসেন বেগ’র ছেলে মোঃ হাবিবুর রহমান শেখ (৪৫), সিরাজগঞ্জের মোঃ স্বপন শেখের ছেলে সজিব (৩৫)। মামলার এজাহারভুক্ত আসামিরা আইনের ফাঁক ফোকর দিয়ে বেরিয়ে এসেছেন।

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ



বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

১১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০১:১৬