খুলনা | শনিবার | ২১ জুলাই ২০১৮ | ৫ শ্রাবণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

কৈশরের দিনগুলি - ১

দুষ্টমি করোনা মিজান, পড়ালেখা করবে তুমি একদিন সমাজের নেতৃত্ব দিতে পারবে, বলতেন বঙ্গবন্ধু

এম এ কবির মুন্সী | প্রকাশিত ২০ নভেম্বর, ২০১৭ ০১:৩১:০০

অন্যের সুখের গল্প শুনে যিনি হাসেন, দুঃখের গল্পে যিনি কাঁদেন, অন্যের সমস্যা নিজের ক্ষমতা বলে সমাধানের চেষ্টা করেন, খুলনায় এমন জনপ্রতিনিধিদের জীবনে রয়েছে অনেক অজানা সুখ ও দুঃখের গল্প। খুলনার স্থানীয় সেই সকল জনপ্রতিনিধিদের জীবনের অজানা গল্প জানে না দলের অনেক নেতা-কর্মী বা জনগণ। তাদের ভালবাসার সেই প্রিয় মানুষগুলোর সুখ-দুঃখের গল্প তুলে এনেছে  দৈনিক সময়ের খবর। এ পর্বে ছোট্ট বেলার স্মৃতিচারণ করেছেন খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মিজানুর রহমান মিজান।
জন্ম থেকেই যার রক্তের কণিকায় আ’লীগের নাম লেখা রয়েছে। যিনি ঘুম থেকে উঠে দেখেছেন, বাবা শামছুর রহমান মানি বাইসাইকেলে করে সিঙ্গা নিয়ে হাট-বাজারে আ’লীগের প্রচার করছেন। তারই হাত ধরে রাজনীতিতে আসেন ছোট্ট মিজান। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু তার বাবা শামছুর রহমান মানি, বেলায়েত হোসেন বাচ্চু, এম এ বারিসহ ১০ জনকে খুলনায় আওয়ামীলীগের হাল ধরতে বলেন। বাবাকে দেখে দেখে ছোটবেলা থেকেই নিজের মধ্যে একটা লিডারশীপ তৈরি হয় এই জনপ্রতিনিধির। গড়ে উঠে বড় একটা বন্ধু সার্কেল।
স্কাউট, কাবাডি, ফুটবল খেলতে পছন্দ করতেন তিনি। গ্রামের পাশে মধুমতি নদীর চরের বালিতে বন্ধুদের নিয়ে দুষ্টমিতে মেতে উঠা, বাবা-মায়ের আদরের এই ছোট্ট মিজানকে নিয়ে মায়ের স্বপ্ন ছিল, ছেলে একদিন বড় ব্যারিস্টার হবে, মানুষের সেবা করবে। একজন ন্যায় বিচারক হবে। আর সেই বিচার মা দর্শকের আসনে বসে দেখবেন। কিন্তু ব্যারিস্টার হতে পারেননি, তাতে কি হয়েছে। একজন জনপ্রতিনিধি হয়ে হাজার-হাজার মানুষের উপকার করছেন। তবে সকল কাজের মাঝে আজও এই জনপ্রতিনিধি তার মাকে খোঁজেন। কিন্তু মা যে না ফেরার দেশে চলে গেছেন, সব থেকে প্রিয় সেই মায়ের মুখটা ছোট্ট মিজানের কাছে ছিল একটা পৃথিবী। মায়ের কথা মনে পড়লে এখনও আবেগ আপ¬ুত হয়ে পড়েন তিনি। মা আজ বেঁচে থাকলে হয়তো আরও ভাল কিছু করতে পারতেন বলে মনে করেন তিনি।
তবে ছোট্টবেলার স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে বর্তমান এ জনপ্রতিনিধি বলেন, স্কুল পালিয়ে বন্ধুদের নিয়ে ট্রেনে করে যশোর যেতে ভালবাসতেন তিনি। কিন্তু বাসায় ফিরলেই বাবা ও চাচার শাসনে ট্রেন ভ্রমণ যেন চোখের জলে ভেসে যেত। ট্রেন ভ্রমণের পাশাপাশি ছোট বেলায় নৌকা চালাতে খুব পছন্দ করতেন তিনি। অপর দিকে নিজ দলের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা হওয়ায়, নৌকার কথা শুনলে এখন পাগল পারা হয়ে যান তিনি।
ছোটবেলায় দুষ্টমির যেন শেষ ছিল না ছোট্ট মিজানের। পানিতে ডুব দিয়ে সেকেন্ড গুণা, উপর থেকে নদীতে লাফ দেওয়া। বাড়ির পাশে মধুমতি নদীতে বন্ধুরা মিল স্রোতে ভাসা, চোরাবালিতে মাজা পর্যন্ত ডেবে মূর্তি হয়ে খেলা করা, কি না করতেন তিনি। তবে ছোটবেলার সেই দুষ্টমির স্মৃতি এখনও চোখের কোনে ভাসছে। শহরে এসে স্থান পরিবর্তন হলেও স্বভাব যেন ছিল একই। তাইতো ইকবালনগরে একটি পুকুরে ডিগবাজি দিতে গিয়ে পানির নিচে গাছে লেগে চোখে আঘাত লাগে তার। এতে চোখের পাতায় ৭/৮টি সেলাই নিয়ে এখনও ঘুরে বেড়ান এই নেতা।
আলহাজ্ব মিজান জানান, “শহরে আসার পর প্রিয় হয়ে উঠে সাইকেল। অনেক কান্নাকাটির পর মা একটা সাইকেল কিনে দিলেও প্রতিদিন এক ঘন্টার বেশি চালাতে দিতেন না। হাফ প্যাডেলে একঘন্টা সাইকেল চালানো হলেই মা উঠিয়ে রাখতেন। তবে মায়ের শাসনের পরও আনন্দ ছিল একটাই। বঙ্গবন্ধু বাবা শামছুর রহমান মানির বন্ধু হওয়ায় প্রায়ই তাঁকে দেখার সৌভাগ্য হতো। একদিন কোলে নিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তুমি দুষ্টমি করোনা বাবা, মন দিয়ে লেখাপড়া করবে, অনেক বড় হবে। একদিন সমাজের নেতৃত্ব দিতে পারবে। সেই স্মৃতি এখনও রাজনীতিতে অনুপ্রেরণা যোগায়।”
বর্তমান এ জনপ্রতিনিধি তার স্মৃতি চারণে আরও বলেন, “বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বাবা শামছুর রহমান মানি বারবার বলতেন, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের জন্য আন্দোলন চালিয়ে যেও। আমরা দেখতে না পারলেও তোমরা একদিন এর বিচার দেখে যেতে পারবা।”
কমার্স কলেজের এই ছাত্র তার স্মৃতিচারণে বলেন, কলেজ জীবনটাকে বেশি উপভোগ করলেও দুঃসহ স্মৃতি এখনও কাঁদায় তাকে। ছোট্টবেলায় ১৯৬৯ সালে দিকে বর্তমান হাদিস পার্কের পাশে সৈয়দ আফজাল কাউতের বাড়িতে গোলাগুলি হয়। সেইদিন তার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন এই নেতা। কানের পাশ দিয়ে একটি গুলি দরজায় লাগে। সেইদিন হয়তো মারা যেতে পারতেন তিনি। কিন্তু আল্লাহর মেহেরবানীতে বেঁচে গিয়ে আজও একাকী থাকলে সেই স্মৃতি তাকে তাড়া করে বেড়ায়।
পুরানো কিছু স্মৃতি মনে পড়েলে এখনও একাকী বসে নিরবে হাসেন বর্তমান এই জনপ্রতিনিধি। তিনি বলেন, একবার এইচএসসি’র রেজাল্ট বের হবার পর বন্ধুদের নিয়ে জীপে করে বের হয়েছিলেন বেড়াতে। কিছুদূর যাবার পর গাড়ির তেল শেষ হয়ে যায়। কারও কাছে টাকা ছিল না। বন্ধুরা অনেকে অনেক মন্তব্য করল, কিভাবে অন্যের থেকে টাকা নিয়ে তেল কিনা যায়। অবশেষে একটা বুদ্ধি করে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তেল কিনে ফিরে আসেন। কিন্তু কিভাবে টাকা যোগাড় করেছিলেন, তা বলতে নারাজ এই নেতা।
সব কিছুর পর সফল বাবা হতে পেরেছেন কি না সেটা সন্তানদের কাছে প্রশ্ন রাখলেও, সফল রাজনীতিবিদ হতে এখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তবে তিনি যে মেধা দিয়ে পরিবারকে গড়ে তুলেছেন এবং শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে পরিবার থেকে রাজনীতিতে কেউ আসতে চাইলে স্বাগত জানাবেন, বললেন তিনি। কারণ পরিবার থেকে রাজনীতিতে কেউ আসলে সেই দল ও রাজনীতির ভীত মজবুত হয় বলে মনে করেন তিনি।
অবসর মুহূর্তে গল্পের বই পড়তে ভালবাসেন এই নেতা। তিনি গোলাপি কালার ও গোলাপি পাজামা পাঞ্জাবী পরতে খুব ভালবাসেন। খিচুড়ি খেতে খুব ভালবাসেন এই নেতা। তবে দাওয়াতে গ্রামবাংলার খাবার খেতে পছন্দ করেন, জানালেন তিনি।
১ জুন জন্মদিন মানে আগে বুঝতেন বাসায় ভাল-ভাল রান্না। এখন সকলকে নিয়ে এক সাথে কেক কাটতে ভালবাসেন তিনি। সর্বশেষে গত জন্মদিনে  মহানগর আ’লীগের সভাপতিকে নিয়ে একসাথে কেক কেটে খুব আনন্দ উপভোগ করেছিলেন তিনি। তবে জন্মদিন উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি, বাংলাদেশ বা বাঙালিয়ানা কোন উপহার পেলে তিনি খুশি হন। সাথে খুশি হন কোন অসহায় মানুষকে সাহায্য করে।
তিনি আরও বলেন, একদিন আফতাব মোল্ল¬া নামের অসহায় এক মুক্তিযোদ্ধা অর্থের অভাবে চিকিৎসা করতে পারছেন না, শুনে ছুটে যান তার জরাজীর্ণ ভাড়াবাড়িতে। এরপর তাকে হাসপাতালে ভর্তি থেকে শুরু করে ওষুধ কেনা, সব কিছু করেছিলেন তিনি।  মুক্তিযোদ্ধা সুস্থ হলে তাকে বাড়ি পৌঁছিয়ে দিয়েই তিনি ক্ষান্ত হননি। সে যাতে ভাল থাকেন সে ব্যবস্থাও করে দিয়েছিলেন। তার সুস্থতার পর ঐ পরিবারের সকলে এসে এক সাথে জড়িয়ে ধরে আনন্দে কেঁদেছিলেন। সেইদিন এ নেতার মনে হয়েছিল মায়ের আশা কিছুটা হলেও পূরণ করতে পেরেছেন তিনি। সেইদিন আল্ল¬ার কাছে দোয়া করেছিলেন, তিনি যেন প্রতিদিন বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের জন্য আরও ভাল কিছু করতে পারেন।
তিনি এমন একজন নেতা, যিনি খুলনার মানুষের মধ্যে এমন ভাবে মিশে গেছেন। যে খুলনার মানুষকে ছাড়া আর কিছুই ভাবতে পারেন না। তিনি মৃত্যুর আগে খুলনাকে পরিকল্পিত একটি শহর দেখতে চান, যেখানে নাগরিকের সকল সুযোগ সুবিধা থাকবে। যেখানে এই শহরের নাগরিকরা এখানেই চাকুরি করবেন।
মহানগর আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ্ব মিজানুর রহমান মিজান নেতা-কর্মী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশ্যে বলেন, বিপদে পড়ে মানুষ মানুষের কাছে আসে। সেজন্য নেতা-কর্মীরা যারা নেতৃত্বে আছেন, তাদেরকে সব সময় মানুষের পাশে থাকতে পরামর্শ দেন তিনি। হতে হবে বেশি বিনয়ী, মনযোগী, বাড়িয়ে দিতে হবে সহযোগিতার হাত। নেতা-কর্মীদের নিয়ে আমরা আন্দোলন করি, সুতরাং তাদের ভাল-মন্দ দেখার দায়িত্বও আমাদের, বললেন তিনি।
সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মিজান সময়ের খবরকে বলেন, এটা খুব ভাল একটি কাজ, যা ইতোপূর্বে কোন পত্রিকা করেনি। আমরা মানুষের কথা শুনি, কিন্তু আমাদের কথা এখন হয়তো আপনাদের মাধ্যমে আমাদের প্রিয় নেতা-কর্মীরা শুনবে।

 

বার পঠিত

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ