খুলনা | সোমবার | ১১ ডিসেম্বর ২০১৭ | ২৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪ |

Shomoyer Khobor

নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাবের শঙ্কায় পেশাজীবী নেতারা

খুলনায় নগর ও জেলা বিএনপি’র দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে

আশরাফুল ইসলাম নূর | প্রকাশিত ১৮ নভেম্বর, ২০১৭ ০২:১০:০০

খুলনা জেলা বিএনপি’র নতুন নেতৃত্বকে স্বাগত জানাননি নগর বিএনপি’র শীর্ষ নেতারা। আবার জেলা শাখার কর্মসূচির ব্যানারে পার্শ্ববর্তী জেলার নেতাদের নাম থাকলেও, নগর বিএনপি’র শীর্ষ নেতাদের দাওয়াত না দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এমন মনোস্তাত্বিক দ্বন্দ্বের কারণে খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপি’র শীর্ষ নেতাদের মধ্যে পারস্পারিক দূরত্ব বেড়েই চলেছে। বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির দায়িত্বশীল কিছু নেতা খুলনার এ অন্তদ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখছেন বলে অভিযোগ দলটির সমভাবাপন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতাদের। অবিলম্বে নগর ও জেলা বিএনপি’র শীর্ষ নেতাদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃস্থাপন না হলে সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস আগামী নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তাদের শঙ্কা।
খুলনায় নগর ও জেলা বিএনপি’র বিভক্তি এখন দিনের আলোর মত দৃশ্যমান। ঐক্যের রেকর্ড ভেঙে দীর্ঘদিন কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচি নগর ও জেলা বিএনপি পৃথক পৃথকভাবে পালন করছে। সাংগঠনিক বিষয় ছাড়াও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছেন নগর ও জেলা বিএনপি’র শীর্ষ নেতারা। নিজ নিজ অনুসারীদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। বিএনপি’র ভ্যানগার্ড খ্যাত অঙ্গ সংগঠনগুলোর অবস্থাও নাজুক। সম্মেলন ছাড়াই কেন্দ্র থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রেরিত নগর ও জেলা যুবদল, ছাত্রদল দীর্ঘদিনেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি করতে পারেনি। ২০১০ সালের জুনে গঠিত নগর ও জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক কমিটি আজও অপূর্ণ। শ্রমিক দল, মহিলা দল, কৃষক দলসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠনগুলো অনেকটাই অদৃশ্যমান। এসবের মূলেই রয়েছে শীর্ষ নেতাদের পারস্পারিক দুরত্ব।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনালিস্ট টিচার্স এ্যাসোসিয়েশন (এনটিএ) সভাপতি অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, “কেন্দ্রীয় নেতারা বিরোধ নিষ্পত্তি না করে পৃথক পৃথকভাবে খুলনায় আসছেন কেন? খুলনা নগর ও জেলা বিএনপি’র বিরোধ তো তারাই পুষে রাখছেন। আজ নগরের কর্মসূচিতে একজন কেন্দ্রীয় নেতা আসছেন, তো কাল জেলা বিএনপি’র প্রোগ্রামে আরেকজন কেন্দ্রীয় নেতা আসছেন। এভাবে একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। কেন কেন্দ্রীয় নেতারা বলতে পারেন না নগর ও জেলা এক সাথে বৃহৎ কর্মসূচির আয়োজন করেন। এক সাথে সকলকে নিয়ে কর্মসূচি করলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক ভাবনার সৃষ্টি হয়। আর এ ধরনের অন্তঃদ্বন্দ্বে নেতা-কর্মীদের মধ্যেই পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়তেই থাকে। দলের অবস্থা ভাল না, ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে ঠেকবে বলা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় নেতাদের উচিত আজই নগর ও জেলা বিএনপি’র শীর্ষ নেতাদের দূরত্ব নিরসন করা।”
সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদ খুলনার সদস্য সচিব ডাঃ সেখ আখতার উজ জামান বলেন, “গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে দেশবাসী বিএনপি’র দিকে তাকিয়ে। এ অবস্থায় নিজের মধ্যে দূরত্ব সত্যিই দুঃখজনক। এখন যদি সংগঠন গুছিয়ে নিজেদের ঐক্যবদ্ধ করা না যায়, তবে আগামী নির্বাচনগুলোতে ভরাডুবি হতে পারে। তিনি বলেন নগর ও জেলা বিএনপি’র শীর্ষ নেতারা তো কেউ কারো প্রতিপক্ষ নন। সকলেই নিজ নিজ যোগ্যতায় বলিষ্ঠ। তাহলে ঐক্যবদ্ধভাবে সাংগঠনিক শক্তি সঞ্চারে বাধা কোথায়?” তিনি আরও বলেন, “কেন্দ্রীয় দায়িত্বশীল নেতারা ইচ্ছা করলে খুলনা বিএনপি’র শীর্ষ নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করা একটি ফোন কলের ব্যাপার মাত্র। নগর ও জেলা বিএনপি’র শীর্ষ নেতাদের দুরত্ব ভেঙে ঐক্যবদ্ধ করা না গেলে, এমনকি পারস্পারিক অবিশ্বাস থাকলে অতি নিকটতম সময়ে দলটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এখনি, হাতে সময় একদম নেই। মনে রাখতে হবে  বিএনপি’র প্রধান প্রতিপক্ষ অত্যন্ত শক্ত ও সম্পদশালী।”
এসব বিষয়ে মহানগর বিএনপি’র সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “খুলনার বিএনপি নেতা-কর্মীদের মধ্যে কোন দূরত্ব নেই। অনেক বড় দল, নেতৃত্ব ও প্রতিনিধিত্বের প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক। তবে নির্বাচনের লড়াইয়ে আমরা সবাই এক ও অভিন্ন। দল যাকে যেখানে মনোনয়ন দেবে সবাই তার পক্ষেই কাজ করবো। সংগঠন গোছানো কাজ চলছে। অঙ্গ সংগঠনের মধ্যে কিছু জায়গায় দুর্বলতা আছে, খুব শিগগিরই তা ঠিক করা হবে। নির্বাচনের আগেই সব দ্বিধা-বিভক্তি নিরসন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
জেলা বিএনপি’র সভাপতি এড. শফিকুল আলম মনা বলেন, “জেলা বিএনপি’র সাথে বা আমার সাথে কারো বিন্দুমাত্র দূরত্ব নেই। দ্বন্দ্ব বা গ্র“পিং নেই। তবে কারো কারো একাধিপত্য ও একনায়কতন্ত্র মনোভাবের কারণেই তেমনটি মনে হতে পারে। জেলা বিএনপিতে কোন কোন্দল নেই। দল চাইলে আমি কেসিসি নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হবো, না চাইলে হবো না, স্পষ্ট কথা। গত নির্বাচনেও মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলাম। দল চায়নি তাই প্রত্যাহার করে বর্তমান মেয়রের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট হয়েছিলাম। কেসিসি নির্বাচনকে সামনে রেখে আমাকে যারা ভালবাসে তারা কেউ কেউ শুভেচ্ছা বিনিময় করতেই পারেন। এতে দল আরও মজবুত হয়’ দলীয় শৃঙ্খলা পরিপন্থি নয়। কেসিসি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল যাকেই মনোনয়ন দেবে তার পক্ষেই সকলেই কাজ করবেন, এমনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করলেন তিনি।”
সংগঠন পুর্নগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপি’র ভাইস-চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, “খুলনা মহানগর ও জেলা বিএনপি পৃথক দু’টি ইউনিট পৃথকভাবে কর্মসূচি করতেই পারে। বিএনপি বড় দল পৃথকভাবে বড় জমায়েত হলে তো ভালই, এটা দোষের কিছু নয়। জনপ্রতিনিধিত্ব পাওয়ার যে প্রতিযোগিতা রয়েছে, নির্বাচনে দল মনোনয়ন দেবার মধ্যে সে দূরত্বের অবসান হবে। সে বিষয়ে দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।”
উল্লেখ্য, গত ৮ জুলাই নগর বিএনপি সদস্য সংগ্রহ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আর ১৯ জুলাই জেলা বিএনপি’র সদস্য সংগ্রহ অভিযানের উদ্বোধন করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পৃথক কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকলেও একে অন্যের আমন্ত্রণপত্রে নাম ছিল না শীর্ষ স্থানীয় নেতাদের। এছাড়া গত ৩০ মে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ বার্ষিকী এবং ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীসহ কেন্দ্র ঘোষিত সকল কর্মসূচিই পৃথকভাবে পালন করছে নগর ও জেলা বিএনপি। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে গত ৮ নভেম্বর জেলা বিএনপি’র সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি। অনুরূপভাবে গত ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নগর বিএনপি’র জনসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় নির্বাহী কমিটির ভাইস-চেয়ারম্যান শাসুজ্জামান দুদু। প্রধান বক্তা ছিলেন বিশেষ সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন। একে অন্যের এসব কর্মসূচিতে দেখা যায়নি নগর ও জেলার শীর্ষ নেতাদের। সর্বশেষ আজ বিএনপি’র সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ৫৩তম জন্মদিন উপলক্ষে জেলা বিএনপি’র আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে আসছেন সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব এড. রুহুল কবির রিজভী। এ কর্মসূচির আমন্ত্রণপত্রে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও নগর বিএনপি’র সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জুর নামই নেই। আগামী ২২ নভেম্বর নগর বিএনপি’র অনুরূপ কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি থাকবেন জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। ফলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, নগর ও জেলা বিএনপি’র পৃথক কর্মসূচিতে এখন কেন্দ্রীয় নেতাদের অতিথি করে আনার প্রতিযোগিতা চলছে।

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ




‘কথা হওয়া দরকার’

‘কথা হওয়া দরকার’

২০ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:১০










ব্রেকিং নিউজ



বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর

১১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০১:১৬