খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৯ অক্টোবর ২০১৭ | ৩ কার্তিক ১৪২৪ |

Shomoyer Khobor

মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে সেনাপ্রধান মিন অং

রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নয়, তাদের বাংলাদেশ থেকে আনা হয়েছে

খবর প্রতিবেদন | প্রকাশিত ১৩ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:১০:০০

রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানের সময় নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ আবারও নাকচ করে দিয়েছেন সেদেশের সেনা প্রধান মিন অং হ্লায়াং। রাখাইনের জাতিগত নিধন আর মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘আইনি রূপরেখার বাইরে গিয়ে কোনও কিছু করা হচ্ছে না।’ রোহিঙ্গাদের আবারও বাঙালি আখ্যা দিয়ে মিয়ানমারের সেনা প্রধান বলেছেন, উপনিবেশেরকালে ব্রিটিশ শাসকরা প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে তাদের নিয়ে এসেছে।
গত বুধবার ইয়ানগুনে মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্কট মার্সিয়েলের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এই দাবি করেন। ডি-ফ্যাক্টো সরকার শাসিত মিয়ানমারে সেনা প্রধান মিন অংকেই সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তি বিবেচনা করা হয়ে থাকে। ক’দিন আগে রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ প্রমাণে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের সেনাপ্রধানের ফেসবুক পেজে বুধবারের ওই বৈঠক সংক্রান্ত বিবৃতি প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, সম্প্রতি রাখাইনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী পরিচালিত গণহত্যা ও অভিযানের খবর এবং বাংলাদেশে ৫ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশ নিয়ে বৈঠকে উদ্বেগ জানান মার্কিন রাষ্ট্রদূত। এর জবাবে মিন অং হ্লায়াং দাবি করেন, বেআইনি কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব পালনের কাজটি রাষ্ট্র নির্ধারিত বিধিনিষেধ, আইন ও অন্য নির্দেশনাগুলোর রূপরেখার মধ্যে থেকে করতে হবে। আইনি কাঠামোকে ছাপিয়ে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।’
ওই ফেসবুক পোস্টে বলা হয়, বুধবারের বৈঠকের সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিয়ানমারের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে একটি গঠনমূলক পথ তৈরি করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় রোহিঙ্গাদেরকে বাঙালি হিসেবে উল্লেখ করে মিয়ানমারের সেনা প্রধান বলেন, ‘স্থানীয় বাঙালিরা আরসার নেতৃত্বাধীন হামলায় জড়িত ছিল। আর সে কারণে অনিরাপদ বোধ করায় তারা পালিয়ে গিয়ে থাকতে পারে।’
সাম্প্রতিক সহিংসতার শিকার হয়ে পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তাকে খুব একটা বিচলিত হতে দেখা যায়নি। রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে অভিহিত করে তাদের দুর্ভাগ্যের জন্য তিনি ব্রিটিশদের দায়ী করে বলেন, ‘বাঙালিদেরকে ব্রিটিশরাই মিয়ানমার নিয়ে আসে। তারা আমাদের দেশি নয়। এমনকি তারা রোহিঙ্গাও নয়। তারা শুধুই বাঙালি।’
জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতর থেকে জানানো হয়, মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী রোহিঙ্গাদের উপর নিধনযজ্ঞ চালিয়েছে। তাদের বাড়ি ও ফসল পুড়িয়ে দিয়েছে। ২৫ আগস্ট হামলার পর চালানো সরকারি বাহিনীর নিধনযজ্ঞে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা।
গত বছর নির্বাচনে জয়লাভ করে দায়িত্ব নিলেও আদতে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতেই সব ক্ষমতা রয়েছে। মিন অং হ্লায়াং বলেন, ‘বাঙালিরা আরসার নেতৃত্বে হামলা চালিয়েছে। নিজেরা বাঁচতে পারবে না জেনেই তারা পালিয়ে যাচ্ছে।’ আগেও রোহিঙ্গা প্রশ্নে একই অবস্থান নিয়েছেন মিন অং। ১৬ সেপ্টেম্বর (শনিবার) নিজের সরকারি ফেসবুক পেজে তিনি রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের জাতিগোষ্ঠী বলে মানতে অস্বীকৃতি জানিয়ে তাদের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। তার দাবি, রোহিঙ্গারা কখনও মিয়ানমারের জাতিগত গোষ্ঠী ছিল না; এটি ‘বাঙালি ইস্যু’।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, সৃষ্ট এই পরিস্থিতির জন্য মিন অং ব্যক্তিগতভাবে দায়ী। তিনি সব সময়ই চেয়েছেন রোহিঙ্গারা ফিরে যাক। মিন অং বলেন, বাঙালিরা বাংলায় ফিরে যাক। তারা হয়তো অন্য দেশেও পালিয়ে গেছে। সেখানেও হয়তো নাগরিকত্ব দাবি করেছে। তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ‘অনেক বাড়িয়ে’ বলা হচ্ছে। আর এর পেছনে অনেক সংবাদমাধ্যম অপপ্রচার চালাচ্ছে।
১৮২৪ সাল থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত মিয়ানমার শাসন করে ব্রিটিশরা। অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের পর ভারতে বার্মা নামে একটি প্রদেশ তৈরি করে ব্রিটিশরা। ভারত থেকেই সেখানে শাসনকার্য চালাতো তারা। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে মিয়ানমার। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, উপনিবেশের অনেক আগেই মুসলিমরা রাখাইন রাজ্যে বসবাস শুরু করে। ব্রিটিশ শাসনামলে এই সংখ্যাই শুধু বৃদ্ধি পেয়েছিল।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও নিপীড়ন চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করলেও বুধবার প্রকাশিত নতুন প্রতিবেদনে জাতিসংঘ রাখাইনে শুদ্ধি অভিযান নিয়ে সেনাবাহিনীর মিথ্যাচারের আলামত হাজির করেছে।  মিয়ানমার ২৫ আগস্টে নিরাপত্তা চৌকিতে আরসার হামলাকে রোহিঙ্গা বিরোধী অভিযানের কারণ বললেও ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে এর আগে থেকেই সেখানে জাতিগত নিধনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাখাইন থেকে সব রোহিঙ্গাকে তাড়িয়ে দিতে এবং তারা যেন আর কখনও রাখাইনে ফিরতে না পারে তা নিশ্চিত করতে পরিকল্পিতভাবে সংগঠিত ও কাঠামোবদ্ধ কায়দায় সেনা-প্রচারণা ও অভিযান চালিয়েছে মিয়ানমার।

 

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ