খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৯ অক্টোবর ২০১৭ | ৩ কার্তিক ১৪২৪ |

Shomoyer Khobor

‘সড়ক সংস্কার, ফুটপাথ দখলমুক্ত ইজিবাইক ও অতুল-মাহেন্দ্রা নিয়ন্ত্রণ প্যানা-সাইন ব্যানার পোস্টার ও ফেস্টুন অপসারণ ’

সিদ্ধান্ত দেখছে না আলোর মুখ!

এস এম আমিনুল ইসলাম | প্রকাশিত ১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০২:১০:০০

সিদ্ধান্ত দেখছে না আলোর মুখ!

সড়ক সংস্কার, ফুটপাথ দখলমুক্ত, অতুল-মাহেন্দ্রা ও ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ, প্যানা-সাইন ব্যানার পোস্টার ও ফেস্টুন অপসারণে খুলনার বিভিন্ন দপ্তর ও সম্মিলিত সভায় একাধিকবার সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও কার্যতঃ তা আলোর মুখ দেখছে না। ফলে নগরবাসীর ভোগান্তি থেকে যাচ্ছে। অবশ্য নাগরিক নেতারা বলছেন দুর্নীতি ও সমন্বয়হীনতার কারনেই মূলতঃ এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তাই সমস্যা সমাধানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সমূহে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। অবশ্য সংশ্লি¬ষ্টরা বলছে, প্রতিটি সমস্যা নিয়ে আন্তরিকতার সাথে কাজ করছেন তারা। খুব শিগগিরই সকল সমস্যার উত্তরণ ঘটবে।
জানা গেছে, মহানগরীতে উদ্ভূত চারটি সমস্যা বেহাল সড়ক, ফুটপাথ দখল, নিয়ন্ত্রণহীন অতুল-মাহেন্দ্রা ও ইজিবাইক এবং প্যানা-সাইন ব্যানার পোস্টার ও ফেস্টুন বর্তমানে বেশ জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ফলে প্রতিনিয়ত ভোগান্তিতে পড়ছে জনসাধারণ। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
সড়ক : মহানগরীতে কেসিসি’র ১ হাজার ২১৫টি সড়ক রয়েছে। যার মোট দৈর্ঘ্য ৬৪০ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রধান সড়ক রয়েছে আড়াই শতাধিক। যার দৈর্ঘ্য ২০০ কিলোমিটারের মতো। চলতি বছরের টানা বৃষ্টিতে এসব সড়কের বেশির ভাগই বিটুমিন ও খোয়া উঠে গিয়ে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মুজগুন্নী, কেডিএ এভিনিউ ও শিপইয়ার্ডসহ বেশ কিছু সড়ক। এছাড়া এ বছর প্রবল বর্ষণ এবং রূপসা নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পূর্ণিমা-অমাবশ্যার জোয়ারে বাঁধ উপচে পানি শহরে প্রবেশ করে। এতে নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। আর এ জলমগ্ন রাস্তা দিয়ে একাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যবাহী যান চলাচলের কারনে রাস্তাগুলোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ফলে জনসাধারণের চলাচলে দারুণ ভোগান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। এ অবস্থায় জনসাধারণের ভোগান্তি কমাতে এবং যাতায়াত সহজ করতে বর্ষায় ক্ষতিগ্রস্ত ভাঙ্গাচোরা সড়ক মেরামত করার সিদ্ধান্ত নেয়া কর্পোরেশন। কিন্তু সে সিদ্ধান্ত এখনও দৃশ্যমান হয়নি।
সড়কের ফুটপাথ : সিটি কর্পোরেশনের অনেক সড়ক ও ফুটপাথই বেদখলে রয়েছে। বিশেষ করে বিআরডিসি রোডের দু’পাশ, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ফেরিঘাট মোড়, ক্লে রোড, সিমেন্ট্রি রোড, খানজাহান আলী রোড, শেরে বাংলা রোড, স্টেশন রোড, জব্বার স্মরণী, জিয়া হলের আশপাশ, মজিদ স্মরণী রোড, জলিল স্মরণী, কদমতলা মোড়, কেডিএ ঘোষ রোডসহ নগরীর অধিকাংশ সড়কের ফুটপাথ দখল করে চায়ের দোকান, কাপড় বিক্রি, কাঠ ও ইট বালিসহ নানা জিনিসপত্র রেখে ব্যবসা পরিচালনা করা হচ্ছে। নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান ও তদারকির অভাবে এ দখলের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ফলে মহানগরীর রাস্তাগুলো একদিকে সরু হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে তীব্র যানজটসহ পথচারীদের চলাচলে চরম বিঘœ সৃষ্টি হচ্ছে। ফুটপাথ দখল মুক্ত করার ব্যাপারে কর্পোরেশন মাঝে মধ্যে ব্যবস্থা নিলেও কার্যতঃ ফল হচ্ছে না। তাই কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি নগরবাসীর।
প্যানা-সাইন, ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন : নগরীর প্রবেশ দ্বার হিসেবে পরিচিত জিরো পয়েন্টের কবি কাজী নজরুল ইসলাম চত্বর থেকে শুরু করে নগরীর সৌন্দর্যবর্ধন স্থান ময়লাপোতা, রয়েল চত্বর, শিববাড়ি মোড়, শহিদ হাদিস পার্ক, নতুন রাস্তার মোড়, দৌলতপুর, শিরোমনিসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে প্যানা-সাইন, ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুনে ভরা। এছাড়া কেডিএ সড়ক, পুরাতন লোয়ার যশোর রোড, রূপসা ঘাট, পিটিআই মোড়, বিভিন্ন কলেজের সামনে, মজিদ সরণি, সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনালসহ ছোট-বড় সড়কের দু’পাশে ও সড়ক বিভাজনেও রয়েছে ক্ষমতাসীন দল আ’লীগ ও বিএনপি নেতাদের অগণিত প্যানাসাইন। নগরীর এমন কোনো সড়ক নেই যেখানে আ’লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা-কর্মীদের শুভেচ্ছা প্যানা টানানো নেই। একবার টানিয়েই নির্ধারিত উৎসব/অনুষ্ঠান বা শুভেচ্ছান্তের মেয়াদ শেষ হলেও ওই সব প্যানা নামানো হয় না। এছাড়া অনেক সড়কে স্থায়ীভাবে নির্মাণ করা হয়েছে তোরণ, যাতে বিশেষ দিবস ও দলীয় শীর্ষ নেতাদের শুভেচ্ছা বার্তায় প্যানাসাইন পরিবর্তন হচ্ছে। যার ফলে নগরীর সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। অনেক সময় জনসাধারনের জন্য চলাচলে হুমকীর কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
ইজিবাইক : নগরীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা ও যানজট নিরসনে ২০১৬ সালের ১১ মে-তে খুলনার তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার আবদুস সামাদ একটি সভার আহ্বান করেন। ওই সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য, খুলনা সিটি কর্পোরেশন মেয়র, বিভাগীয় কমিশনার, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ ও খুলনা জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় নগরীতে ইজিবাইকের সংখ্যা ৫ হাজারে নামিয়ে আনা, ইজিবাইকের শো-রুম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু নানা কারণে ওই সিদ্ধান্ত এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। চলতি মাসের গোড়ার দিকে বিভাগীয় প্রশাসনের নির্দেশে সেই তৎপরতা ফের শুরু হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গত ৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় নগর ভবনে ইজিবাইক ও যানজট নিরসন সংক্রান্ত বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন সিটি মেয়র মনিরুজ্জামান মনি।  বৈঠকে খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মিজানুর রহমান মিজান, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশীদসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, পূর্বের ১ হাজার ৯৬০টি ইজিবাইকের সঙ্গে নতুন করে আরও ৩ হাজার ৪০টির অনুমতি দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে নগরীর স্থায়ী বাসিন্দা অথচ ইজিবাইক চালক এমন লোক অগ্রাধিকার পাবে। ওই সব ইজিবাইকে সবুজ রং দিয়ে মার্কিং করা হবে। এছাড়া নগরীর বাইক এর বাইরে অর্থাৎ জেলায় এবং জেলার ইজিবাইক নগরীতে আসতে পারবে না। খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য বেগম মন্নুজান সুফিযান, সিটি মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ হারুনুর রশিদ এসব ইজিবাইক বাছাইয়ে সুপারিশ করবেন। মূলতঃ এই ৪ জনের যে কোন একজনের সুপারিশেই ৩ হাজার ৪০টি ইজিবাইককে নতুন করে অনুমতি দেওয়া হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে এখনও কোন কার্যকরী পদক্ষেপ দৃষ্টি গোচর হচ্ছে না।
অতুল-মাহেন্দ্রা : মহানগরীর ভাঙ্গাচোরা রাস্তায় অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে বেপরোয়া গতিতে চলাচল করছে অতুল-মাহেন্দ্রা। কোন প্রশিক্ষণ ছাড়াই বেপরোয়া গতিতে এসব অতুল-মাহেন্দ্রা চালাচ্ছেন চালকরা। ফলে প্রায়ই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। ফলে এ যান নিয়ে বর্তমানে শঙ্কিত জনসাধারণ। গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর নগরীর জোড়াগেট এলাকায় অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, বৈধ কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকায় জরিমানা আদায় করে জেলা প্রশাসন। এরপরও অতুল-মাহেন্দ্রার লাগাম ধরা সম্ভব হয়নি।
জানা গেছে, খুলনা সিটি কর্পোরেশন, জেলা প্রশাসন, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ-এর দপ্তর, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) ও খুলনা ওয়াসার আভ্যন্তরীণ সভাসহ বিভিন্ন সময় সম্মিলিত সভায় এ সব বিষয়ে নানা আলোচনা হয়। যার প্রেক্ষিতে সড়ক সংস্কার, ফুটপাথ দখলমুক্ত, অতুল-মাহেন্দ্রা ও ইজিবাইক নিয়ন্ত্রণ, প্যানা-সাইন ব্যানার পোস্টার ও ফেস্টুন অপসারণে সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পরবর্তী এ সিদ্ধান্ত আলোর মুখ দেখে না। ফলে সমস্যা নিরসন না হয়ে আরও জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। যার দুর্ভোগ পোহাতে হয় নগরবাসীর।
এ সম্পর্কে দেশের সংবিধান প্রণেতা এড. এনায়েত আলী সময়ের খবরকে বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহে রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ঢুকে পড়েছে। এছাড়া খুলনার প্রতিষ্ঠান সমূহে সমন্বয় নেই। এ ধরনের দুর্নীতি ও সমন্বহীনতার কারনে নগরীতে আজ এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কোন সিদ্ধান্ত সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে নগরবাসীকে পোহাতে হচ্ছে ভোগান্তি। উদ্ভূত এ সমস্যা সমাধানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সমূহে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদের নির্দেশনা মেনে চলা অতীব জরুরী। তাহলে খুলনা নান্দনিক নগরায়নে পরিণত হবে।
কর্পোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফ নাজমুল হাসান বলেন, প্রতিটি সমস্যা নিয়ে কর্পোরেশন আন্তরিকতার সাথে কাজ করছে। খুব শিগগিরই সড়ক সংস্কার কাজ শুরু হবে। ইজিবাইক সমস্যা সমাধানে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তালিকা হাতে পেলে দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। এছাড়া ফুটপাথ দখলমুক্ত ও প্যানা-সাইন ব্যানার পোস্টার ও ফেস্টুন অপসারণে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে খুলনা জেলা প্রশাসক আমিন উল আহসান বলেন, শহরে এসব সমস্যা সমাধান হওয়া খুবই জরুরী। তা সমাধানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমন্বয় মিটিং-এর আয়োজন করা হচ্ছে। বিভিন্ন পরামর্শ ও নির্দেশনাও দেয়া হচ্ছে। এখন সংশ্লি¬ষ্ট সংস্থাগুলোকে এ সকল সমস্যা সমাধান করতে হবে। তারপরও জেলা প্রশাসন উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ