খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৯ অক্টোবর ২০১৭ | ৩ কার্তিক ১৪২৪ |

Shomoyer Khobor

নগরীর অধিকাংশ পাবলিক টয়লেটের দুরাবস্থা : ভোগান্তিতে পথযাত্রীরা

এম এ কবির মুন্সী | প্রকাশিত ১২ অক্টোবর, ২০১৭ ০২:১০:০০

বয়রা মুজগুন্নী ১৭নং রোডের বাসিন্দা আমিনুর রহমান, একজন ডায়াবেটিস রোগী। বয়রা চার রাস্তায় কথার ফাঁকে তিনি বলেন, খুলনা এখন কষ্টের শহর। যানজট, রাস্তা ঘাট থেকে শুরু করে বর্তমানে খুলনা সিটিতে এমন কি আছে যেখানে মানুষের কষ্ট নাই। প্রতিদিন সকালে নগরীর অলি গলিতে শতশত বিভিন্ন বয়সের রোগীরা হাটতে বেড় হয়। এর মধ্যে কারো টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হলেই বিপদ। নগরীর কোথায় টয়লেট সেটাও যেমন বেশির ভাগ মানুষের অজানা, আবার অবস্থান জানলেও সেটি আদৌ খোলা আছে না নাকি বন্ধ তা নিয়েও দ্বিধায় থাকতে হয়।
আমিনুল রহমান বলেন, আজকাল অনেকেরই ডায়াবেটিস দেখা দিচ্ছে। এতে করে ঘন ঘন প্রসাবের বেগ আসে। ঘর থেকে বের হলে টয়লেটের টেনশনে আরও ঘন ঘন প্রসাবের বেগ আসে। এজন্য কতোাঁ সমস্যায় পড়তে হয় তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউই বুঝবে না।
নগরীতে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ চলাচল, পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম। বিভিন্ন সময়ে বেদখল ও পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার পর যেগুলো অবশিষ্ট আছে সেগুলোও ব্যবহারের অনুপযোগী। শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে পর্যাপ্ত টয়লেট না থাকায় ফুটপাতসহ যত্রতত্র প্রসাব করছেন পথচারীরা। পাশাপাশি শহরের কয়েক লাখ ভাসমান জনগণ, যারা রাস্তার ধারে ও পার্কে মলমূত্র ত্যাগ করে। এতে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ।
সরেজমিনে নগরীর দৌলতপুর, নতুন রাস্তা, সোনাডাঙ্গাসহ বেশ কয়েকটি এলাকার পাবলিক টয়লেটগুলো ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ এলাকার টয়লেটগুলোতে স্বাভাবিক পরিবেশ নেই। কোথাও দরজা নেই, ছিটকিনি নেই, অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ, পর্যাপ্ত আলো-বাতাস নেই, অপরিচ্ছন্ন, কলগুলোর বেশিরভাগই নষ্ট।
সোনাডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে এক ঘন্টা পর্যবেক্ষণে দেখা যায় প্রতি ৫ মিনিটে একজন বাইরে খোলাস্থানে প্রস্রাব করছে। লজ্জায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খোলা স্থানে প্রস্রাব করতে থাকা এক ব্যক্তি বলেন, টয়েলেটে ঢুকে দেখেন। আপনি এক মিনিটও থাকতে পারবেন না। এত গন্ধ, দরজা নেই, ছিটকিনি নেই, অন্ধকার, স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ, কলগুলোর বেশির ভাগই নষ্ট। নাগরিকের প্রতি কোন দায় নেই সিটি কর্পোরেশনের, কিছু কিছু রাস্তা আছে যা পাশ দিয়ে প্রস্রাবের গন্ধে হাটা যায় না।
যশোর থেকে একজন বয়স্ক নারী ও তার মেয়ে দাঁড়িয়ে আছেন সোনাডাঙ্গা পাবলিক টয়লেটের সামনে ভেতরে ঢুকতে গিয়েও ফিরে এসেছেন দু’বার। স্যাঁতস্যাঁতে ও অন্ধকার পরিবেশের মধ্যে ভেতরে গোসল করছেন একজন পুরুষ। পাশেই প্রস্রাব করেছেন দুজন। টয়লেটের দায়িত্বে রয়েছেন একজন পুরুষ। এতগুলো পুরুষের মধ্যেই কোনো উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়ে নাকে কাপড় ঢেকে ভেতরে গিয়ে ঢুকলেন। বাইরে থেকে পরিবেশ যেমনটা দেখছিলেন ভেতরের পরিবেশ আরও ভয়াবহ। দুর্গন্ধে ভরপুর। যত্রতত্র মেঝের ওপর জমে আছে পানি। মহিলাদের জন্য নির্ধারিত আলাদা কোনো টয়লেট না থাকায় ব্যবহার করতে হয়েছে কমন টয়লেট। পানি নেয়ার পাত্রটির হাতলের একটি অংশ ভাঙা। ট্যাপ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। অশ্লীল সব কথাবার্তা দেয়াল জুড়ে লেখা। এই পরিবেশের মধ্যেই সারতে হলো সোনাডাঙ্গায় মা-মেয়ের টয়লেটের কাজ।
তিনি বলেন, একজন পুরুষ কোথাও পাবলিক টয়েলেট না পেলে রাস্তার পাশে জরুরী কাজ সারতে পারেন। কিন্তু আমরা মহিলারা বড় অসহায়। না রাস্তার পাশে জরুরী কাজ সারতে পারছি, না কোন অপরিচিত বাসায় যেতে পারছি। তাই বাধ্য হয়ে পুরুষের মধ্যে এই নোংরা জায়গায় কাজ সারতে হয়।
পাবলিক টয়েলেট ইজারাদার খানজুর হোসেন বলেন, আমরা একাধিকবার সিটি কর্পোরেশনে জানিয়েছি, সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা ছবি তুলেও নিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন হলেও কোন ফল হয়নি। আমরা চেষ্টা করি পরিষ্কার রাখতে কিন্তু এ সকল পাবলিক টয়েলেটের আবকাঠামো ভাল না। পরিস্কার করে লাভ হয় না। প্রস্রাবে ৩ টাকা ও পায়খানার জন্য ৫ টাকা না নিলে আমরা চলব কি ভাবে।
এলাকায় পথচারী ইমরুল বলেন, আশপাশে কোনো পাবলিক টয়লেট খুঁজে না পেয়ে বাধ্য হয়ে রাস্তার পাশে প্রস্রাব করেছি। খারাপ লাগে, কিন্তু কাছে কোথাও না পাওয়ায় বাধ্য হয়েছি।
সিটি কর্পোরেশনের নিয়ম অনুযায়ী প্রস্রাবে ২ ও পায়খানা করলে ৩ টাকা নেয়ার কথা থাকলেও যেসব পাবলিক টয়লেটের অস্তিত্ব আছে সেখানে ৩ ও ৫ টাকা করে নেয়া হচ্ছে।
জানা গেছে, সিটি কর্পোরেশন পাবলিক টয়লেটগুলো নিজেরা পরিচালিত না করে বেসরকারি পর্যায়ে ইজারা দিয়ে রেখেছে। সেগুলো ব্যবহার করতে প্রত্যেকে ৩-৫ টাকা খরচ করতে হয়। যা দরিদ্রদের জন্য কষ্টসাধ্য। আবার নজরদারি না থাকায় ইজারাদাররা বেশি টাকা আয়ের জন্য পাবলিক টয়লেটের পানি বিক্রি করে থাকেন। গাড়ি ধোঁয়ার কাজে, টোকাই কিংবা ছিন্নমূল মানুষদের কাছে এই পানি বিক্রি করেন তারা। এমনকি টয়লেটগুলো মাদক ব্যবসায়ীদের লেনদেনেরও স্থান হয়ে উঠেছে।
সোনাডাঙ্গা কেডি,এ বাসস্ট্যান্ড এলাকায় তিনটি পুরাতন পাবলিক টয়লেটে গিয়ে দেখা গেছে, একটি সিটি কর্পোরেশনের অন্য দুইটি কেডিএ’র, যার সবগুলোই ব্যবহারের অযোগ্য। স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, প্রায় দুই যুগ আগে তৈরি এ পাবলিক টয়লেটটি অনেক আগেই ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।
সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী-২ মোঃ লিয়াকত আলী খান বলেন, পাবলিক টয়লেটের জন্য আমাদের বাজেট রয়েছে। কিছু কিছু পাবলিক টয়েলেটের অবস্থা ভাল নয় স্বীকার করে তিনি বলেন আমরা পর্যায়ক্রমে এগুলো মেরামত করব এবং নগরীর বিভিন্ন স্থানে আরও কিছু পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা করা প্রকল্প নেয়া হয়েছে। তবে এ সকল পাবলিক টয়েলেট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব ইজারাদের। টেন্ডারের শর্তেই বলা আছে।

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ