খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৯ অক্টোবর ২০১৭ | ৩ কার্তিক ১৪২৪ |

Shomoyer Khobor

মুর্হারমের তাৎপর্য

মুফতী শামছুল হক সা’দী আল-হাবীবী | প্রকাশিত ০১ অক্টোবর, ২০১৭ ০০:০০:০০

মুসলমানদের জন্য আরবী বা ইসলামী মাসসমূহের হিসাব রাখা ফরজে কিফায়াহ। আরবী বা ইসলামী মাসসমূহের মধ্যে চারটি মাস অত্যন্ত সম্মানিত। সে মাসসমূহ হলো, যিলক্বদ, যিলহজ্ব, রজব ও মুর্হারম। তার মধ্যে আবার মুর্হারমের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। ইসলামী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী মুর্হারম মাস হলো প্রথম মাস। ইসলামী বা আরবী নববর্ষ। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনুল কারীম ও পবিত্র হাদীস শরীফের আলোকে জানা যায় যে, মুর্হারমসহ উল্লেখিত চারটি হারাম/পবিত্র তথা নিষিদ্ধ বা সম্মানিত  মাসগুলিতে সকল প্রকার গুণাহ বর্জন করতে হবে এবং যথাসম্ভব বেশি বেশি নেক আ’মাল করতে হবে। প্রিয় মহানবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুর্হারম মাসকে ‘মহান আল্লাহ্র মাস’ হিসেবে অভিহিত করে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করেছেন। যেমনটি বোঝা যায় সহীহ মুসলিম শরীফ ২য় খন্ড, ৮৬১ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হাদীস দ্বারা-পবিত্র রমাজানুল মুবারকের পরে সবচেয়ে বেশি উত্তম বা ফযীলত পূর্ণ রোজা  হলো “মহান আল্লাহ্র মাস মুর্হারমের রোজা।” আশুরার তাৎপর্য: মুর্হারমের দশ তারিখকে বলা হয় আশুরা। আশুরা-এর শাব্দিক অর্থ দশম। সাধারণতঃ আশুরা বলতে মুর্হারমের দশম তারিখকেই বোঝানো হয়। আশুরা কী, আশুরা উপলক্ষে আমাদের কী করণীয় এ সম্পর্কে আমাদের অনেক ভুল বোঝাবুঝি আছে। সাধারণভাবে আশুরা বললে আমাদের মনে হয় যে, এই দিনে প্রিয় মহানবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রাণাধিক প্রিয়তম দৌহিত্র, জলীলুল কদর সাহাবী প্রিয় হযরত ইমাম হুসাইন (রঃ) কারবালার প্রান্তরে মর্মান্তিকভাবে শহীদ হয়েছিলেন। আশুরার তাৎপর্য বোধহয় এখানেই। আমরা মনে করি কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আশুরার তাৎপর্য। আশুরাকে আমরা কারবালা বানিয়ে ফেলেছি। কিন্তু মূলতঃ আশুরার তাৎপর্য কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নয়। বরং হাদীসে এসেছেঃ প্রিয় মহানবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনায় হিজরত করার পর দেখলেন সেখানকার বনী ইসরাঈলরা অর্থাৎ, ইয়াহুদীরা আশুরার দিন অর্থাৎ, মুর্হারমের দশ তারিখে রোজা রাখে। প্রিয় মহানবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতে চাইলেন তারা এই দিনে রোজা রাখে কেন? তাঁকে জানানো হলো যে, এই দিনে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীন তাঁর কুদরতে বনী ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করে নিয়েছেন, আর ফিরআউন ও ফিরআউনের বাহিনীকে সমুদ্রে নিমজ্জিত করেছেন। এর শোকর আদায় করার জন্য সম্মানিত নবী প্রিয় হযরত মূসা আলাইহিস সালাম রোজা রেখেছেন। কারণ এটা মহান আল্লাহ্র কতবড় একটা নেয়ামত ছিল যে, কোন রকম নৌযান ছাড়া এই মহাসমুদ্র তাঁরা পার হতে পারলেন।  মহান আল্লাহ্র কুদরতে পানি ফাঁক হয়ে সমুদ্র গর্ভে রাস্তা বের হয়ে গেল এবং জলীলুল কদর নবী প্রিয় হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও তাঁর অনুসারীগণ সেই রাস্তা দিয়ে পার হয়ে গেলেন। আর ফিরআউন তার বাহিনীসহ সেখানে নিমজ্জিত হয়ে গেল। এই মহা নেয়ামতের শোকর আদায় করার জন্য সম্মানিত নবী প্রিয় হযরত মূসা আলাইহিস সালাম রোজা রাখতেন এবং তাঁর অনুসারীরা অর্থাৎ বনী ইসরাঈলরা তথা ইয়াহুদীরা  জলীলুল কদর নবী প্রিয় হযরত মূসা আলাইহিস সালামের অনুসরণে রোযা রেখে আসছিল। প্রিয় মহানবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন জানতে পারলেন যে, ইয়াহুদীরা তাদের গোত্রের পূর্বসূরীদের উপর মহান আল্লাহ্র যে নেয়ামত ঘটেছিল সেই নেয়ামতের শোকর আদায়ের জন্য সম্মানিত নবী প্রিয় হযরত মূসা আলাইহিস সালামের অনুসরণে রোজা রেখে আসছে। তখন তিনি বললেনঃ অর্থাৎ, আমরা সম্মানিত নবী প্রিয় হযরত মূসা আলাইহিস সালামের অনুসরণ তোমাদের চেয়ে বেশি করব। তাই সম্মানিত বিশ্বনবী, নবীকুল শিরোমনি প্রিয় হযরত মুহাম্মাদ সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোজা রাখা শুরু করলেন এবং সম্মানিত সাহাবায়ে কেরাম (রঃ) আজমাঈনদেরকেও রোজা রাখতে বললেন। এই হল আশুরার দিনের তাৎপর্য। নেয়ামতের শোকর আদায় করার  শিক্ষা গ্রহণ  করাই হলো এই দিনের শিক্ষা। [সহীহ বুখারী শরীফ ২য় খন্ড, ৭০৪ পৃষ্ঠা, সহীহ বুখারী শরীফ (দারু কাছীর, বৈরুত) ৪র্থ খন্ড, ১৭২২ পৃষ্ঠা, সহীহ মুসলিম শরীফ (দারু এহইয়াইল কুতুবিল আরাবিয়্যা, কাইরো, মিশর) ২য় খন্ড, ৭৯৬ পৃষ্ঠা এবং সুনানে ইবনে মাজাহ শরীফের বরাতে মাকতাবাতুল আশরাফ, ১১, ইসলামী টাওয়ার, বাংলাবাজার, ঢাকা থেকে প্রকাশিত আল্লামা হাফেজ হেমায়েত উদ্দীন দা বা এর আহকামুন নিসা ১০৯-১১০ পৃষ্ঠা ইত্যাদির আলোকে লিখিত।] এছাড়া প্রিয় মহানবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের বহু বছর পরে ১০ই মুর্হারমে কারবালার মর্মান্তিক ঘটনায় তাঁর প্রাণাধিক প্রিয়তম দৌহিত্র, জলীলুল কদর সাহাবী প্রিয় হযরত ইমাম হুসাইন (রঃ) কারবালার প্রান্তরে মর্মান্তিকভাবে শহীদ হয়েছিলেন। অনেক মর্যাদাপূর্ণ এই শাহাদাতের মাধ্যমে তিনি ইসলাম জিন্দা করার জন্য প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ত্যাগ করতে হবে, এমনকি নিজের জীবনকেও মহান আল্লাহ্র দরবারে নজরানা পেশ করতে হবে এই শিক্ষাই আমাদেরকে দিয়ে গেছেন। তাইতো কবি বলেন-“ত্যাগ চাহি মোর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।” অতএব,তাঁর মহান ত্যাগের আর্দশ অনুসরণ-ই হলো কারবালার শিক্ষা। আশুরার রোজার ফযিলাত: সহীহ মুসলিম শরীফ ১ম খন্ড, ৩৬৮ পৃষ্ঠা, মিশকাত শরীফ ১৭৯ পৃষ্ঠায় বর্ণিত হাদীসে আছে, প্রিয় মহানবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি মহান আল্লাহ্র নিকট আশাবাদী যে, আশুরার দিনের রোজা তার পূর্ববর্তী এক বছরের গুণাহ মুছে দেবে। নাসাঈ শরীফের সূত্রে মিশকাত শরীফ ১৮০ পৃষ্ঠায় এসেছে, প্রিয় হযরত মা হাফসা রযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন চারটি বিষয়কে কোন সময় সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্বশেষ, সম্মানিত বিশ্বনবী প্রিয় জনাবে মুহাম্মাদে আরাবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিছুতেই পরিত্যাগ করতেন না। (১) আশুরার রোজা। (২) যিলহজ্ব মাসের ১০ (অর্থাৎ ৯ দিনের) রোজা। (৩) প্রতি মাসে ৩টি রোজা। (৪) ফজরের ফরজ নামাজের পূর্বে ২ রাকাত সুন্নাত নামাজ। রজীন, বাইহাক্বী শরীফের সূত্রে মিশকাত শরীফ ১৭০ পৃষ্ঠায় এসেছে, জলীলুল কদর ফক্বীহ সাহাবী প্রিয় হযরত আব্দুল্লাহ ইব্নে মাসউদ রযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, জলীলুল কদর প্রিয় মহানবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আশুরার দিন স্বীয় পরিবারে পর্যাপ্ত পরিমাণে ব্যয় করে, মহান আল্লাহ পাক তাকে সারা বছর পর্যাপ্ত দান করবেন। স্বনামধন্য বিখ্যাত তাবেঈ হযরত সুফিয়ান সাওরী রহ. বলেন, আমরা (সুদৃঢ় ইয়াক্বীনের সাথে) এর পরীক্ষা করে অনুরূপ ফল পেয়েছি। মাসআলা: ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ১ম খন্ড, ২০২ পৃষ্ঠা, মারাক্বিউল ফালাহ্্ ২৫০ পৃষ্ঠায় বর্ণিত ইসলামিক ‘ল’/ফাত্্ওয়া অনুযায়ী আশুরা তথা মুর্হ্রামের ১০ তারিখে রোজা রাখা মুস্তাহাব সাওয়াব মূলক আমল। কিন্তু শুধু ১০ তারিখে রোজা রাখা মাকরূহ্, তাই এর সঙ্গে ৯ তারিখে বা ১১ তারিখে আরেকটি রোজা মিলিয়ে রাখতে হবে। জরুরী জ্ঞাতব্য বিষয় : (১) মহাগ্রন্থ আল-কুরআনুল কারীম ও পবিত্র হাদীস শরীফের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রিয় মহানবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সকল পবিত্র প্রিয় সহধর্মিণীগণ,কলিজার টুকরা পবিত্র মেয়ে প্রিয় হযরত মা ফাতেমা রযিয়াল্লাহু আনহা, সুযোগ্য জামাতা ও চাচাতো ভাই জলীলুল কদর সাহাবী আমীরুল মু’মিনীন, খলীফাতুল মুসলিমীন প্রিয় হযরত আলী রযিয়াল্লাহু আনহু, প্রাণাধিক প্রিয়তম দৌহিত্রদ্বয় জলীলুল কদর সাহাবী প্রিয় হযরত ইমাম হাসান রযিয়াল্লাহু আনহু, প্রিয় ইমাম হুসাইন রযিয়াল্লাহু আনহুসহ প্রিয় মহানবী সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরিবার বা আহলে বাইতের সকল সদস্যকে পাশাপাশি সকল সাহাবায়ে কেরাম রযিয়াল্লাহু আনহুম আজমাঈনকে দিল থেকে ভালবাসতে হবে, মুহাব্বাত করতে হবে। কেননা, এগুলো হচ্ছে ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মুহাব্বাত দ্বারা মূল উদ্দেশ্যে হচ্ছে, তাঁদের আদর্শ অনুসরণ করা,তাঁদেরকে গালমন্দ না করা,তাঁদের কষ্টে ব্যথিত হওয়া এবং তাঁদের যারা কষ্ট দিয়েছে তাদের কর্মকান্ডকে ঘৃণা করা ইত্যাদি। তবে তার মানে এই নয় যে, কারবালার ঘটনার শোক প্রকাশের নামে প্রতি বৎসর আশুরার দিনে শোক, বিলাপ, মাতম, আহাজারি, তাযিয়া মিছিল ইত্যাদির আয়োজন করতে হবে। শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা এগুলো করলেও এগুলোর সাথে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। এগুলো সবই ভিত্তিহীন, অতিরঞ্জিত, পরিত্যাজ্য/বর্জনীয়।  জরুরী জ্ঞাতব্য বিষয়: (২) ইমাম আবুল হাসানাত মুহাম্মাদ আব্দুল হাই লাখনৌভী আল-হিন্দী আল-হানাফী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর ফাত্্ওয়া অনুযায়ী আশুরার দিন রোজা ব্যতিত এবং পরিবার-পরিজনের ওপর খরচে প্রশস্ততা ব্যতিত তৃতীয় কোন বিষয় সুন্নাত হিসাবে প্রমাণিত নেই এবং তার দলিলও নেই। সুতরাং আশুরার দিন রোজা রাখা ও পরিমিত ব্যায়ে পরিবারের ওপর খরচে প্রশস্ততা করা উচিৎ। আর বাকী কিছুই না করা উচিৎ। প্রিয় মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদেরকে সহীহ্্ভাবে বুঝার ও আ‘মাল করার তৌফিক দান করুন, আমিন।

লেখক ; মুহ্তামীম/প্রিন্সিপ্যাল : মুহাম্মাদিয়া ক্বওমী মহিলা মাদ্রাসা খুলনা।

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ



কর্মীর হাত আল্লাহর প্রিয়

কর্মীর হাত আল্লাহর প্রিয়

০৪ অক্টোবর, ২০১৭ ১৩:৩৩

ভালো কাজে উৎসাহ ও অসৎ কাজে বাধা

ভালো কাজে উৎসাহ ও অসৎ কাজে বাধা

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০১:৩৫

পবিত্র আশুরা ১ অক্টোবর

পবিত্র আশুরা ১ অক্টোবর

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:৩৫

একাত্মবাদকে হৃদয়ে আঁকড়ে ধরতে হবে

একাত্মবাদকে হৃদয়ে আঁকড়ে ধরতে হবে

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৪:০১





পবিত্র ঈদুল আযহা ২ সেপ্টেম্বর

পবিত্র ঈদুল আযহা ২ সেপ্টেম্বর

২৪ অগাস্ট, ২০১৭ ০০:২০

জমজমের পানিতে মনোবাসনা পূরণ

জমজমের পানিতে মনোবাসনা পূরণ

২৭ জুলাই, ২০১৭ ০১:৪৩


ব্রেকিং নিউজ