খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৯ অক্টোবর ২০১৭ | ৩ কার্তিক ১৪২৪ |

Shomoyer Khobor

‘ভক্তিতে মুক্তি’ মনোভাবই মূলমন্ত্র

এম এ কবির মুন্সী | প্রকাশিত ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০১:৩০:০০

দিঘলিয়া হাজী গ্রামের জেলে পাড়ার হরেন ঠাকুর। তার শিষ্য মাছুদ। হরেন ঠাকুর নামে মাছুদই রোগী দেখে। তার  নিকট গিয়ে দাম্পত্য কলহে (কাল্পনিক কহিনী) স্ত্রী চলে যাওয়ার ঘটনা বলতেই তিনি হাত দু’টি দেখে বললেন ‘শনির দশা।’ সরিষা পড়া ও তাবিজ দিলে এ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে, স্ত্রী ফিরে আসবে সাত দিনের মধ্যে। আর খরচ হবে ৯শ’ ৫০ টাকা। ‘কার স্ত্রী ফিরে আসবে, বউতো ঘরেই আছে।’ নিজের পেশাগত পরিচয় দিয়ে স্ত্রী চলে যাওয়ার ঘটনা কাল্পনিক বলতেই তিনি প্রথমে হতবাক পরে ক্ষিপ্ত হন। উপস্থিতিদের চাপে তিনি শান্ত হন। বিনয়ের সাথে বলতে থাকেন ‘তিনি আসলে হরেন ঠাকুর নয়,  হরেন ঠাকুরের শিষ্য। তার আসল নাম  মাছুদ। এবার নিজের ভুল স্বীকার করে বলেন, ৬ জন রোগী দেখলে ৩ জনের কাজ হয় তো বাকিদের কাজ হয় না। আমরা শুধু ফুকই দি বাকি টা ভক্তিতে মুক্তি। আপনিও যে কোন কিছু পড়ে ফুক দিলে যদি কেউ ভক্তি করে তবে সে ফুকে কাজ হবে। আমার গুরু আমাকে এভাবেই শিক্ষা দিয়েছে।’ হরেন ঠাকুর ও তার শিষ্য মাছুদের মত “ভক্তিতে মুক্তি” এমন প্রবাদ বাক্যকে কাজে লাগিয়ে তারা তদবির দেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রোগীদের ভক্তি অর্জন করতে টাকার বিনিময়, রিক্সা, অটো ভ্যান চালক ও স্থানীয় ভাড়াটিয়াকে মুরিদ হিসেবে ভন্ড তদবিরকারিরা ব্যবহার করে থাকেন। চালকদের দায়িত্ব রোগী তাদের বাহনে উঠলে কোন তদবিরকারির বাড়ি যেতে চায় তা জেনে নেওয়া। এরপর ওই তদবিরকারির প্রশংসা করতে করতে চালক কৌশলে কোন তদবিরকারির কাছে যাচ্ছেন, সেই খবরটি জেন নেয়। যে তদবিরকারির কাছে রোগী যেতে চেয়েছিলেন সেই তদবিরকারিকে ওই রোগী সম্পর্কে সকল তথ্য ফোন করে জানিয়ে দেয়।
অপরদিকে যে সকল  ব্যক্তি  ভ্যানে, রিক্সা, অটোতে  আসে না, তাদের জন্য রয়েছে মুরিদগণ। এদের কাজ তদবিরকারির বাড়ির আশপাশে থাকা। নতুন কেউ এলেই তাদের সাথে নিজে সমস্যাগ্রস্ত হয়ে কথা বলা। কথার ফাঁকে কি কারনে তদবিরকারির কাছে আসছে তা কৌশলে জেনে তদবিরকারিকে জানিয়ে দেয়। ওই রোগী তদবিরকারির কাছে গেলে প্রথমে রোগীর নাম শুনে নিশ্চিত হয়ে নেন তদবিরকারি। এর পর ওই রোগী সম্পর্কে চালক ও মুরিদের দেওয়া তথ্য অনুসারে বলতে থাকে। সুতরাং রোগীর এসব গোপন কথা শুনে কবিরাজের উপর ভক্তি চলে আসে। আবার অনেক তদবিরকারি বিভিন্ন বই পড়ে তদবির করেন। রোগীকে যা বলেন দেখা যায় ১০টার মধ্যে ৫টা খেটে যায়। এ ভাবে
নিজের  অজানা কথা তদবিরকারির মুখে শুনে অনেটা অবাক হন রোগী। তখন ভক্তির মাত্রা বেড়ে যায় অনেকগুণ। আর এ সুযোগটা কাজে লাগান তদবিরকারি।
এরপর তদবিরকারি রোগীকে ঝাঁড়-ফুক, তাবিজ কবজ যা দিবেন সব কিছুই ভক্তিসহকারে ব্যবহার করবেন রোগী। এভাবে তাবিজ কবজ, ঝাঁড় ফুকের নামে ধাপে ধাপে রোগীকে নিস্ব করে দিচ্ছেন আমাদের সমাজের এ সকল ভন্ড তদবিরকারিরা।
একবার কবিরাজের উপর ভক্তি চলে আসলে তদবিরকারি তাবিজ, কবজ, ঝাঁড় ফুক তদবির যা দেন তা খুব ভক্তি সহকারে নেন রোগী। তাতে কখনও  কাজ হয় আবার কখনও হয় না ।
এমন মনভাব কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন তাবিজ, কবজ, ঝাঁড়, ফুক ও তদবিরের ব্যবসা করছে আসা একাধিক তদবিরকারি নিজেদের মুখে স্বীকার করেন। ভক্তিতে মুক্তি এটাই তাবিজ, কবজ, ঝাঁড়, ফুক ও তদবিরের মূল মন্ত্র।
দিঘলিয়া হাজী গ্রাম জেলেপাড়ার হরেন ঠাকুর, একই উপজেলার ভোরমোগাতীর মিলন, নিখিল ঠাকুর, সেনহাটি দেয়াড়ার নওয়ার আলি হুজুর, ইকরাম হুজুর, সাহেব আলি হুজুর, রায়ের মহলের আমেনা বেগম ওরফে কালুর মা, গফ্ফার হুজুর, ডুমরিয়া কুলটি দক্ষিণ পাড়া চিত্ররঞ্জন মন্ডল, ডুমরিয়ার রাজবান্দ বটতলার গৌউর বাওয়ালি সকলে নিজের মুখে এ প্রতিবেদকের কাছে স্বীকার করেন। আসলে তাবিজ, কবজ, ঝাঁড়, ফুক, তদবিরের মুল মন্ত্র ভক্তিতে মুক্তি। এটাই তাদের তদবিরের বড় পুঁজি।
এ প্রসঙ্গে আব্দুর রহমান (ছদ্দ নাম) নামের ফুলবাড়ীগেট খেয়া ঘাটের এক ভ্যান চালক কবিরাজের সাথে তার সখ্যতার কথা স্বীকার করেন। নিয়মিত ভ্যান যাত্রী রহিমা বেগম বলেন, ‘আমি দেয়াড়ায় বসবাস করি। খুলনায় একটি অফিসে চাকুরি করি। যে কারণে প্রতিদিন ভ্যানে করে যাতায়াত করতে হয়। তখন ভ্যানে বসে এ সকল নানা কথা শুনে থাকি।
ব্যবসায়ী মোঃ নুরুজ্জামান বলেন, আমার মায়ের একবার খুব পেটে ব্যথা হয়েছিল। তখন মা আমাকে বললেন, আমাদের বাড়ির পাশের এক কবিরাজের থেকে পানি পড়ে আনতে। আমি বাহিরের কল থেকে কিছুসময় পর পানি এনে নিজে পানিতে ফুক দিয়ে মাকে বললাম এই নেও কবিরাজ এক নিশ্বাসে খেতে বলছে। পানিটা খেলে কিছু সময় পর মায়ের পেটের ব্যথা কমে গেল। অথচ আমি নিজে পানিতে ফুক দিয়ে মাকে পানি দিয়েছিলাম। মূল কথা হল ভক্তিতে মুক্তি।
ডাক্তার জহিরুল ইসলাম (এমবিবিএস) বলেন, ডাক্তারি সাইন্সে কবিরাজী বিশ্বাস করে না প্রমান চায়।  তবে ভক্তিতে মুক্তি কথাটি অনেকটা সত্য বলে তিনি মনে করেন।
খুলনা আলিয়া মাদ্রাসার ভাইস প্রিন্সিপ্যাল মুফতি মোঃ আঃ রাজ্জাক বলেন, কল্যাণ-অকল্যাণ, ভাল-মন্দ, ক্ষতি-উপকারের মালিক একমাত্র আল্লাহ। তিনিই রোগ দেন, সুস্থ করেন। তিনি বিপদ দেন আবার তিনিই তার থেকে মানুষ কে পরিত্রাণ দেন। কোনো ব্যক্তি বা বস্তুর মধ্যে কারো ক্ষতি বা কোনো উপকার করার কোনো ক্ষমতা নেই। এগুলো কুফরি সম্পূর্ণ নাজায়েজ।

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ



নগরীর সিসি ক্যামেরাগুলো অকেজো!

নগরীর সিসি ক্যামেরাগুলো অকেজো!

০৫ অক্টোবর, ২০১৭ ০২:১০








কোকেন চোরাচালানে কারা জড়িত?

কোকেন চোরাচালানে কারা জড়িত?

১৮ অগাস্ট, ২০১৭ ০২:১০



ব্রেকিং নিউজ