খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৯ অক্টোবর ২০১৭ | ৩ কার্তিক ১৪২৪ |

Shomoyer Khobor

সর্বশান্ত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চাষিরা

গলদার মূল্য হ্রাসে রেকর্ড

আশরাফুল ইসলাম নূর | প্রকাশিত ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০২:১০:০০

চিংড়ি শিল্পের অনিশ্চয়তা কাটছে না। বহির্বিশ্বে চিংড়ির দাম কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ ভাবেও নানা জটিলতায় পড়েছেন রফতানিকারকরা। ফলে লোকসান পুষিয়ে নিতে কম মূল্যে গলদা কিনছে তারা। খোলা বাজারেও বিক্রি হচ্ছে গলদা চিংড়ি। মূল্য হ্রাসে রেকর্ড করায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গলদা চাষিরা লোকসানে পড়ে সর্বশান্ত হচ্ছে।
মৎস্য অফিস সূত্র জানায়, খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও যশোর জেলায় দশ লক্ষাধিক চিংড়ি ঘের রয়েছে। ঘেরে ভাইরাস ও নানা রোগের প্রকোপ মোকাবেলা করে যখনি বাজারজাতকরণের সময় তখন আন্তর্জাতিক বাজারে অর্ধেক মূল্যে চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে। গত বছর যে গলদা কেজি প্রতি বিক্রি হয়েছে ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত। সেই সাইজের গলদা এ বছর প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৫০০ থেকে সাড়ে ছয়শ’ টাকায়। তাও অনেক সময় ক্রেতাদের কাছে বাকীতে বিক্রি করতে হচ্ছে।
দিঘলিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এইচ এম বদরুজ্জামান জানান, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মুদ্রার দরপতন ঘটায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে মাছ কেনাবেচায় নতুন ও পুরাতন নিয়মের জটিলতাও এ ক্ষেত্রে কিছুটা প্রভাব ফেলেছে।
খুলনা বিভাগের মধ্যে গলদা চিংড়ি চাষে ডুমুরিয়া প্রথম স্থানে। এখানে প্রায় ২৫ হাজার গলদা চিংড়ির ঘের রয়েছে। কৃষকরা গলদা চিংড়ি চাষে অধিক লাভবান হয়ে ঘের ব্যবসায়ে ঝুঁকে পড়েছিল। সেই স্বপ্ন আজ ফিকে হতে চলেছে।
ডুমুরিয়ার চাষিরা জানান, জমির লিজের টাকা, মৎস্য খাবার, পোনা ক্রয়, পাহারাদারের বেতনসহ প্রতি কেজি গলদা উৎপাদনের খরচ বিক্রয় মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। ফলে ঘের মালিকদের লিজের টাকা দিতে পারছে না। যদি অবস্থার পরিবর্তন না হয় তাহলে তারা আর গলদার চাষ করবেন না তারা। গেল বছর যে গলদার দাম তেরশ’ টাকা ছিল। এ বছর সে গলদার দাম সাড়ে পাঁচশ’ থেকে সর্বোচ্চ সাতশ’ টাকা।
ডুমুরিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সরোজ কুমার মিস্ত্রী জানান, গলদার দাম বৃদ্ধি না পেলে কৃষকরা উৎসাহ হারাবে।
সূত্রমতে, ভাইরাসমুক্ত পোনার সংকট, চিংড়ির ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, উৎপাদনে কারিগরি জ্ঞানের অভাব ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় বৃদ্ধিতে আর্থিক ক্ষতির মুখে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন উপকূলের ১০ লাখ চিংড়ি চাষি। চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে এরই মধ্যে অনেক ঘের মালিক গলদা-বাগদা চিংড়ি চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এ ছাড়া চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ মহামারীর মতো রূপ নিয়েছে। এতে চিংড়ির গুণগতমান যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চিংড়ির কদর হারিয়ে যেতে বসেছে।
জেলা মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, খুলনাসহ উপকূলীয় জেলার প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার হেক্টর জমিতে প্রতিবছর বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাষ হয়। এর মধ্যে শুধু খুলনায় চিংড়ি চাষে যুক্ত রয়েছেন প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এখানে প্রায় ৭০ হাজার মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদন হয়। চলতি বছর বাগদার উৎপাদন কিছুটা বাড়লেও কমেছে গলদার।
খুলনা বিভাগীয় উপ-পরিচালক মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রক প্রফুল্ল কুমার সরকার জানান, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে চাহিদার ঘাটতি হওয়ায় এ অবস্থা হয়েছে। তবে ২৫ ডিসেম্বরের পর দাম একটু বৃদ্ধি পেতে পারে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
রূপসা চিংড়ি বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ আব্দুল মান্নান জানান, তার সমিতির অধীনে ৪০০ ব্যবসায়ী রয়েছেন। রফতানি কমে যাওয়ায় সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ঢালাওভাবে পুশের অভিযোগ সঠিক নয় বলে তিনি দাবি করে বলেন, কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ীর জন্যই এ অভিযোগটি সকল ব্যবসায়ীর গায়ে লাগছে।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তার অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে ৫৪ হাজার ৯৩৫টি ঘের রয়েছে। এ বছর ৬৬ হাজার ৮৯০ হেক্টর জমিতে বাগদা চিংড়ি চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ২৭ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। গত বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২২ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন। তবে উৎপাদন হয়েছিল ২৬ হাজার ৮০০ মেট্রিন টন। এবার উৎপাদন ভাল তবে মূল্য হ্রাসে চাষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শহীদুল ইসলাম জানান, সারাদেশের উৎপাদিত বাগদা ও গলাদার মধ্যে এক তৃতীয়াংশ উৎপাদিত হয় সাতক্ষীরায়। এবার বাজার মূল্য কম হওয়ায় চাষিরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে।
বাগেরহাটে সাদা সোনাখ্যাত গলদা চিংড়ির দাম কেজিতে ৩০০ টাকার বেশি কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন জেলার ৪৩ হাজার চিংড়ি চাষি।
বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ জিয়া হায়দার জানান, জেলাতে প্রায় ৪৩ হাজার চাষি প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ করেন। দাম পড়ে যাওয়া সবাই বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। যুক্তরাজ্যসহ আমদানিকারক দেশগুলোয় অর্থনৈতিক মন্দার কারণে চিংড়ির দাম পড়ে গেছে বলে আমাদের দেশের রফতানিকারকরা দাবি করছেন। এছাড়া বছরের এ সময়টায় চাষিরা ঘের প্রস্তুত করার জন্য সব চিংড়ি ধরে বিক্রি করে দেন। রফতানিকারকরা মাছের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ার এ সুযোগটা অনেক সময় নিয়ে থাকে। তবে চিংড়ির দাম আবার আগের জায়গায় ফিরবে বলে আশা করছেন তিনি।
চিতলমারী উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা গৌতম মন্ডল জানান, কিছু অসাধু চাষি গলদা চিংড়ির খাবার হিসেবে পোল্ট্রি ফিড ব্যবহার করায় সম্প্রতি চিংড়িতে এ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেছে। ফলে আমদানিকারক দেশে দরপতন ঘটে। তাছাড়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারণেও মাছের দর কম রয়েছে।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন সূত্র জানায়, দেশে ৯০টি চিংড়ি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে খুলনায় ৫৬টি থাকলেও চালু রয়েছে ৩০টি। দেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হলেও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ থেকে চিংড়ি আমদানিতে অনীহা বেড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে এ শিল্পে।
এসোসিয়েশনের পরিচালক ও আছিয়া সী ফুডস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ তারিকুল ইসলাম জহির বলেন, গলদা রফতানিতে বর্তমানে একটা স্থবির অবস্থার তৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গলদার চাহিদা কমে যাওয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারগুলোতে। কবে নাগাদ এ অবস্থার অবসান হবে; তা এই মুহূর্তে বলা অসম্ভব।

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ









ব্রেকিং নিউজ