খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৯ অক্টোবর ২০১৭ | ৩ কার্তিক ১৪২৪ |

Shomoyer Khobor

বিকাশের মাধ্যমেই প্রতারণার শিকার সাধারণ গ্রাহকরা

জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়াই অবৈধ লেনদেন হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে!

এম এ কবির মুন্সী | প্রকাশিত ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০২:১০:০০

সরকারি বিএল কলেজের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র ইমন হাওলাদার। পড়া লেখার খরচ বাবদ প্রতিমাসে বাবা গ্রাম থেকে টাকা পাঠান। চলতি মাসে শুরুতে বাবা টাকা পাঠাতে ভুল করেননি। প্রতারকের ফাঁদে পা দিয়ে বড় ভুল করছেন ইমন হাওলাদার।
বাবা টাকা পাঠানোর কিছু সময়ের মধ্যেই অচেনা একটা নম্বর থেকে সলেমান নামে একজন ফোন করেন তার ফোনে। সলেমান নামের পাঁচ হাজার টাকা ভুল করে ইমনের বিকাশে চলে এসেছে। এ বলে টাকাটা পাঠিয়ে দিতে বলেন সলেমান। ইমন সৎভাবে টাকাটা সত্যিই পাঠিয়ে দেন সলেমান নামক প্রতারকের বিকাশ একাউন্টে। কিছু সময় যেতে না যেতেই ইমনের বাবা ফোন করে বলেন পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়েছি পেয়েছ। ততক্ষণে ইমন প্রতারক সলেমানকে টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে। এরপর একাধিকবার চেষ্টা করেও নম্বরটি খোলা পায়নি ইমন।  ইমনের প্রশ্ন আমার বাবা যে পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়েছে এটা প্রতারক জানলো কিভাবে।  ইমনের মত খুলনার সাধারণ জনগণ বিকাশের মাধ্যমে প্রতারিত হচ্ছে।
অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, চাঁদাবাজি আর প্রতারণার অবৈধ লেনদেনের সহজ মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা বিকাশ। পাঁচ হাজার টাকা ও তার উর্ধ্বে বিকাশে লেনদেন করলে। তাকে অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি জমা দিয়ে টাকা উত্তোলন করা বাধ্যতামূলক। তবে এ নিয়ম মানছে না খুলনার অধিকাংশ বিকাশ এজেন্ট।
মামুন কাজী নামের এক গ্রাহক বলেন, আমার বাবা দুবাই থেকে আমাদের বিকাশে ২০-৩০ হাজার টাকা পাঠায়। আমরা সে টাকা এজেন্ট থেকে তুলে আনি আইডি কার্ড লাগে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন এজেন্ট বলেন, আমরা যখন বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠাই। তখন দেখা যায় পাশে থেকে প্রতারক চক্র নম্বরটি দেখে ঐ গ্রাহককে ফোন করে প্রতারণার একটি ফাঁদ পাতে। এজন্য কেউ টাকা পাঠালে নিয়ম হচ্ছে, সাথে সাথে জানিয়ে দেওয়া যে আমি তোমার বিকাশে টাকা পাঠিয়েছি। হুন্ডি ব্যবসা খুব কম এজেন্ট করে। তবে অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, চাঁদাবাজি আর প্রতারণার অবৈধ লেনদেন হলে আমরা বুঝতে পারি। তখন অনেক সময় বন্ধ করার ইচ্ছা থাকলেও সাহস পাই না। তবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিকাশে পাঠান থেকে শুরু করে এমন কি মোবাইলে লোড ও দেওয়া যায়।
মোবাইল রিচার্জ ও মোবাইল ব্যাংকিং-এর সভাপতি শেখ সুজন আহমেদ বলেন, আমাদের অনেক বিকাশ এজেন্টের লেনদেন বন্ধ করা হয়েছে। এ কারণগুলো আমাদেরকে না জানালে আমরা সকল এজেন্ট মালিকরা আতঙ্কে আছি। যে টাকা পাঠায় সে বৈধ না অবৈধ সেটা তো আমাদের জানার কথা না। কেউ যদি হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠান, তবে সেটা তো আমাদের থেকে বিকাশ কোম্পানির ভাল জানার কথা। তিনি বলেন, আমার জানা মতে এ পর্যন্ত নগরীতে ১১ জনের লেনদেন বন্ধ করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে নগরীতে তিনহাজার এজেন্ট রয়েছে।
বিকাশের জেনারেল ম্যানেজার মোঃ মোর্শেদুজ্জামান বলেন, এখনও পর্যন্ত আমরা সঠিক করে বলতে পারছি না, খুলনার কতগুলো এজেন্টের লেনদেন বন্ধ হয়েছে। তবে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, যেখানে একজন গ্রাহককে ব্যাংক থেকে ৫-১০ হাজারের অধিক লেনদেন করতে হলে জাতীয় পরিচয়পত্র জমাসহ একাধিক তথ্য দিতে হয়। সেখানে বিকাশে প্রতিদিন একজন লোক লাখ লাখ টাকা লেনদেন করছেন। কিন্তু তাদের কোন জবাবদিহিতা নেই। এজন্যই বিকাশ, রকেট, শিওর ক্যাশ, মাইক্যাশসহ প্রতিটি কোম্পানিকে বেছে নিয়েছে হুন্ডি, অর্থপাচার, সন্ত্রাসে অর্থায়ন, চাঁদাবাজি আর প্রতারণার অবৈধ লেনদেনের সহজ মাধ্যম হিসাবে ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী, একজন গ্রাহক তার জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে বিকাশ, রকেট, শিওর ক্যাশ, মাইক্যাশসহ যেকোন লেনদেনের জন্য একটির বেশি হিসাব খুলতে পারবেন না। এ নিয়ম মানছে না দেশের মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো। বিকাশ-তার মধ্যে অন্যতম।
জানা গেছে, একাধিক সিম ও পরিচয়পত্রের মাধ্যমে একাধিক হিসাব খুলে অর্থ আত্মসাৎ করছে বেশ কয়েকটি প্রতারক চক্র। কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্দেশিত কেওয়াইসি ফরম যথাযথভাবে পূরণ না করেও এজেন্ট হচ্ছেন অনেকে, যা প্রতারণার অন্যতম হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিকাশে লেনদেন সহজ ও দ্রুত হওয়ায় এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধের সুবিধা থাকায় এ ধরনের ব্যাংকিংয়ের জনপ্রিয়তা দিন-দিন বাড়ছে। বিপুল সংখ্যক গ্রাহক জড়িয়ে পড়েছেন মোবাইল ব্যাংকিংয়ে। তবে আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, এ পদ্ধতিতে অর্থ লেনদেনে গ্রাহকের কোনো তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের কাছে নেই। ফলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে জালিয়াতি বন্ধ হচ্ছে না।
দেশের জেলা ও উপজেলা থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে মোবাইল ব্যাংকিং সিস্টেম বিকাশের মাধ্যমে হুন্ডির শক্তিশালী নেটওয়ার্ক। যার প্রভাব পড়েছে প্রবাসী আয় রেমিট্যান্সের ওপর। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিকাশের লোগোসহ সাইনবোর্ড ও ব্যানার ব্যবহারের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন হচ্ছে। যার কোনো অনুমোদন নেই। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তাই হুন্ডি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বিকাশ এজেন্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাটি।
তারই পরিপেক্ষিতে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত থাকায় মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান বিকাশের ২ হাজার ৮৮৭টি এজেন্টের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ১ হাজার ৮৬৩টি গ্রাহক হিসাব বন্ধেরও নির্দেশ দেওয়া হয়। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও সন্ত্রাসবিরোধী আইন অনুযায়ী এসব সিদ্ধান্ত দিয়েছে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ



নগরীর সিসি ক্যামেরাগুলো অকেজো!

নগরীর সিসি ক্যামেরাগুলো অকেজো!

০৫ অক্টোবর, ২০১৭ ০২:১০



‘ভক্তিতে মুক্তি’ মনোভাবই মূলমন্ত্র

‘ভক্তিতে মুক্তি’ মনোভাবই মূলমন্ত্র

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০১:৩০





কোকেন চোরাচালানে কারা জড়িত?

কোকেন চোরাচালানে কারা জড়িত?

১৮ অগাস্ট, ২০১৭ ০২:১০



ব্রেকিং নিউজ