খুলনা | সোমবার | ২১ মে ২০১৮ | ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

ভাষা সংগ্রামী আশরাফ খান

মোহাম্মদ মিলন | প্রকাশিত ০১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:২৮:০০

ভাষা সংগ্রামী আশরাফ খান

১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ। এখানকার ছাত্ররা দিন-রাত মিটিং মিছিলে ব্যস্ত। মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি ডাঃ গোলাম মওলার নেতৃত্বে এ প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অন্যান্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন, শহিদ ডাঃ আব্দুল আলিম চৌধুরী, ডাঃ মঞ্জুরুল হক, খুলনার সামসুর রহমান ও টুটপাড়ার আশরাফ হোসেন খান। তাদের সেদিনের সংগ্রামী ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে।
১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনের সময় আশরাফ খান ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন (ক-৭ ব্যাচ)। ৫২’র একুশে ফেব্র“য়ারি ঢাকার রাজপথে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করা প্রতিবাদ মিছিলে তিনি শরীক ছিলেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে অস্থায়ী শহিদ মিনার তৈরিতে তিনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। পুলিশের ধাওয়া ও হুলিয়ার কারণে তিনি দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ এই দাবিতে ঢাকা শহরে আন্দোলন ও জনমত গঠনে তার তৎপরতা তখন প্রশংসার দাবি রাখে।  
মরহুম এই ভাষা সৈনিকের স্ত্রী সরকারি করোনেশন বালিকা বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকা জেরিনা বানু। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র বাগেরহাটের বিখ্যাত বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ সরকারি বক্ষব্যাধি ক্লিনিকের প্রধান ও সিনিয়র কনসালটেন্ট ডাঃ মাহমুদ হোসেন খানের সাথে আলাপ চারিতায় আরো জানা যায় যে, রাজনীতি সচেতন এই মানুষটি ছাত্র জীবন থেকেই বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ছিলেন। তখনকার প্রতিকূল পরিবেশের ভেতর বঙ্গবন্ধু ঢাকা মেডিকেল চত্বরে কোন কাজে বা সভা মিটিং এ আসলে তাকে সঙ্গ সাহচর্য দিয়ে ডাঃ আশরাফ নিজেকে ধন্য মনে করতেন। এই কারণে মেডিকেলের ছাত্র বন্ধুরা তখন তাকে ‘মুজিব ভক্ত’ নামে ডাকা শুরু করে। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে আগরতলা মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে খুলনার রাজপথ কাঁপানো সৈনিক হিসেবেও আয়ুব শাহীর সামরিক জান্তার কালো তালিকায় তিনি স্থান পান। ফলে ৪ ফেব্র“য়ারি ১৯৬৯ সালে তিনি মার্শাল ল আইনে গ্রেফতার হয়ে খুলনা জেলে অন্তরীন হন। সেদিন তার ছোট ছেলের জন্মদিন অনুষ্ঠান শোক আতঙ্ক ও ক্রন্দনে ভারী হয়ে ওঠে। স্বাধীনতার আগে মুসলিম লীগের পেটোয়া গুন্ডা বাহিনীর বাধা নিষেধের কারণে খুলনা শহরে জেলা বা শহর আওয়ামী লীগের কোন স্থায়ী কার্যালয় না থাকায় বিভিন্ন নেতা-কর্মীর বাসা বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে আওয়ামী লীগের জরুরী মিটিং সমূহ অনুষ্ঠিত হতো। নগরীর পিকচার প্যালেস সিনেমার সন্নিকটে কাজী জাফর সাহেবদের বিল্ডিং মার্কেটে (বর্তমান জলিল টাওয়ার) ডাঃ আশরাফ খানের খান ফার্মেসীতে প্রায়শই আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারণী ও গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক মিটিং সমূহ অনুষ্ঠিত হতো- এটাও তার ৬৯ সালের মার্শাল ল আইনে গ্রেফতার হবার বিশেষ কারণ ছিলো। তিনি তদানীন্তন খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন।
১৯৭১ সাল মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সপরিবারে গ্রামের বাড়ি ডুমুরিয়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের অর্থনৈতিক ভাবে সাহায্য সহযোগিতা দানে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। পরবর্তীতে রাজাকারদের তৈরি করা হত্যা তালিকায় তার নাম ওঠায় তিনি সপরিবারে সেখান থেকে পালিয়ে খুলনা শহরে আত্মীয়ের বাসায় কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর বাগেরহাটের প্রত্যন্ত গ্রামে আত্মীয়ের বাসায় আশ্রয় নিয়ে তার গ্রামের বাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং আপন চাচাতো ভাই রাজা মিয়াকে ধরে নিয়ে নির্মমভাবে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে গুলি করে হত্যা করে। যশোরে তার আপন ভাইরা ভাই সুবিখ্যাত ডাক্তার কাজী ওবায়দুল হক পাক বাহিনীর গুলিতে ১৯৭১ সালে শহিদ হন।
১৯৭২ সালে খুলনা রেডক্রসের প্রথম মহাসচিব ছিলেন তিনি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এই রাজনৈতিক কর্মী ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট নির্মম হত্যাকান্ডের পর মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন। স্পঞ্জের স্যান্ডেল পরে এই হত্যাকান্ডের নিঃশব্দ প্রতিবাদ জানান। তৎকালীন গোয়েন্দা পুলিশের জেরার মুখে এই নান্দনিক ও অভিনব প্রতিবাদের অবসান ঘটে। এক বুক দুঃখ নিয়ে শোকে মুহ্যমান তিনি খুলনায় দীর্ঘ ২০ বছরের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা পেশার প্রাকটিস বন্ধ করে ১৯৭৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যে ডাক্তারী চাকুরি নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান।
ডবদেশে থাকাকালীন তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবিতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ও প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে সুযোগ পেলেই সোচ্চার হয়ে ওঠে এ ব্যাপারে জনমত গঠনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। পরবর্তীতে দেশে ফিরে চিকিৎসা পেশা, জনসেবা ও এবাদত বন্দেগীতে আমৃত্যু নিঃশব্দে কাজ করে গেছেন।
তার বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মকান্ডের কারণে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধের স্থপতি প্রয়াত সৈয়দ মায়নুল হোসেন তার খালুর বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডের ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন। ডাঃ আশরাফ হোসেন খানের বোন জামাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য প্রয়াত ডাঃ আবু ইউসুফ আলম প্রায়শই বলতেন আমার নিকটাত্মীয়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ডের জন্য এ অঞ্চলের মানুষ গর্বিত।
এ ভাষা সংগ্রামীর স্মৃতি রক্ষার্থে গঠিত হয়েছে ডাঃ আশরাফ হোসেন খান স্মৃতি সংসদ ও গবেষণা কেন্দ্র। যার পুরোভাগে রয়েছে আঞ্চলিক লোক প্রশাসন কেন্দ্রের উপ-পরিচালক সৈয়দ রবিউল আলম।    

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বাঙলার বৈশাখ : বাঙালির বৈশাখ

বাঙলার বৈশাখ : বাঙালির বৈশাখ

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৯

বর্ষবরণ-১৪২৫

বর্ষবরণ-১৪২৫

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৫২

বাংলা পঞ্জিকা ও বাংলার আবহাওয়া

বাংলা পঞ্জিকা ও বাংলার আবহাওয়া

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৫০






বৈশাখে দেশী মজাদার খাবার

বৈশাখে দেশী মজাদার খাবার

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৫

নতুনের আহ্বান

নতুনের আহ্বান

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৫

বোশেখ 

বোশেখ 

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৫

বৈশাখের আমেজ

বৈশাখের আমেজ

১৪ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:৪৪


ব্রেকিং নিউজ



যে কারণে রোজা নষ্ট হয় 

যে কারণে রোজা নষ্ট হয় 

২১ মে, ২০১৮ ০০:৫৯

যে কারণে রোজা নষ্ট হয় 

যে কারণে রোজা নষ্ট হয় 

২১ মে, ২০১৮ ০০:৫৯