খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১৬ অগাস্ট ২০১৮ | ৩১ শ্রাবণ ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

হজ্বে¡র লক্ষ্য আল্লাহ্’র জিকির বাস্তবায়ন

মাহের বিন হামদ | প্রকাশিত ০১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০০:২২:০০

‘রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যখন আযরাক উপত্যকা অতিক্রম করে যাচ্ছিলেন, তখন বললেন, এটি কোন উপত্যকা? সঙ্গীরা উত্তর দিলেন, আযরাক উপত্যকা। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, আমি যেন মুসা (আঃ) কে গিরিপথ থেকে অবতরণ করতে দেখছি। তিনি উচ্চঃস্বরে তালবিয়া পাঠ করছিলেন। তারপর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হারশা গিরিপথে এলেন। তিনি বললেন, এটি কোন গিরিপথ? সঙ্গীরা বললেন, হারশা গিরিপথ। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, আমি যেন ইউনূস বিন মাত্তা (আঃ) কে দেখছি। তিনি সুঠামদেহী লাল বর্ণের উটের পিঠে আরোহিত। গায়ে একটি পশমি জোব্বা। আর তাঁর উটের রশিটি খেজুরের ছাল দিয়ে তৈরি। তিনি তালবিয়া পাঠ করছিলেন।’ (সহি মুসলিমে ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত)
আল্লাহর ঘরের সম্মানিত অতিথিরা, অভিনন্দন জানাই আল্লাহ যাতে আপনাদের বিশিষ্ট করেছেন। আপনারা এসেছেন তাঁর মহান ঘরে। ইসলামের বৃহত্তর রুকন-স্তম্ভ প্রতিষ্ঠার লক্ষে, দূরদূরান্ত থেকে প্রাচীন ঘর অভিমুখে তালবিয়া মুখে। এ পবিত্র ভূমিতে হজ্ব¡-ওমরার নিয়তে পদার্পণ মর্যাদা বাড়ায় এবং গোনাহ-পাপরাশি ক্ষমা করে। বোখারি ও মুসলিমে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘ওমরা থেকে ওমরা-মধ্যবর্তী পাপরাশির কাফফারা। আর কবুল হজ্বে¡র একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত।’
হে আল্লাহর বান্দারা, এই তো মক্কা ও তার ঐশ্বর্য, কাবা ও তার সৌন্দর্য। এখানেই জমজম, হিজ্বর, হাজরে আসওয়াদ, মাকামে ইব্রাহিম, সাফা, মারওয়া, মাশআরে হারাম, মিনা ও আরাফা। কত নবী-রাসুলই না এ ঘরের সফর করেছেন। কতজনই না এসব পবিত্র স্থান দিয়ে আসা-যাওয়া করেছেন-ইহরাম পরে, তালবিয়া বলে।
এই তো আল্লাহর রাসুল (সাঃ)। বিদায় হজ্বে তিনি অতিক্রম করছেন সুবিশাল মরুভূমি। তাঁর কাছে যেন এর পাহাড়ি ও নিম্নভূমি এবং টিলা ও উপত্যকাগুলো নিজের গল্প তুলে ধরছে। বলে যাচ্ছে কে কে তার ওপর দিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছে।
মুসনাদে আহমদে বর্ণিত হয়েছে, হজ্বে¡ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) উসফান উপত্যকা অতিক্রমকালে উল্লেখ করেন, এ স্থান দিয়ে হুদ ও সালেহ (আঃ) অতিক্রম করেছিলেন। প্রাচীন ঘরে হজ্বের উদ্দেশ্যে তালবিয়া পড়তে পড়তে। বিদায় হজ্বে আরাফার অবস্থানে নবী (সাঃ) জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘তোমরা হজ্বের নিদর্শনপূর্ণ স্থানগুলোয় অবস্থান করো। কেননা তোমরা নিজেদের পিতা ইব্রাহিমের ঐতিহ্যের ওপর আছ।’ (সুনান আবু দাউদ)।
নবী (সাঃ) নিজ উম্মতকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন সম্মানিত নবীদের অবস্থা। উম্মত যাতে তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে পারে; চলতে পারে তাঁদের দেখানো পথে। পবিত্র কোরআনও এদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এভাবেÑ ‘আর তোমরা ইব্রাহিমের দাঁড়ানোর জায়গাকে নামাজের জায়গা বানাও।’ (সূরা বাকারা : ১২৫)। নবীদের পিতা ও তাওহিদপন্থিদের নেতার অনুসরণার্থে। ‘এরা এমন ছিলেন, যাদের আল্লাহ পথপ্রদর্শন করেছিলেন। অতএব, আপনিও তাদের পথ অনুসরণ করুন।’ (সূরা আনআম : ৯০)।
বিদায় হজ্বে জুমার দিন আরাফার পবিত্র ভূমিতে জিবরাঈল (আঃ) নবীজির ওপর অবতীর্ণ হন আল্লাহর সত্যের অমোঘ ঘোষণা নিয়েÑ ‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের ওপর আমার নেয়ামতকে পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে ইসলামে সন্তুষ্ট হয়ে গেলাম।’ (সূরা মায়িদা : ৩)। এজন্যই নবী (সাঃ) কোরবানির দিন জনতার উদ্দেশে বলছিলেন, ‘তোমরা (আমার কাছ থেকে) তোমাদের হজ্বের বিধিবিধান শিখে নাও। কেননা আমি জানি না হয়তো এই হজ্বের পর আমি আর হজ্ব¡ করতে পারব না।’ (মুসলিম)।
আল্লাহর বান্দারা, হজ্ব¡ এক বিশাল পুণ্য নিদর্শন। এ আদি ঘরের মহত্ত্বে তা মহিমান্বিত। এতে আগমনকারী কাফেলায় অবিরত এসেছেন নবী-রাসুলরা। এ পথে এসেছেন ইবরাহিম, সালেহ, হুদ, মুসা, ইউনুস, মুহাম্মদ প্রমুখ আম্বিয়া (আঃ)। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘মসজিদে খাইফে ৭০ জন নবী নামাজ পড়েছেন।’ (মুজাম তাবারানি)। এমনকি তাঁদের ঐতিহ্য ধরে শেষ জামানায় ঈসা বিন মারইয়ামও আসবেন। মুসলিমে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘যার হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম। অবশ্যই মারইয়ামপুত্র হজ্ব বা ওমরা অথবা উভয়ের নিয়তে তালবিয়া পড়তে পড়তে ফাজ্জে রাওহায় আসবেন।’
সুতরাং নবীদের ধর্ম অভিন্ন। সবাই এসেছেন একক রবের ইবাদত নিয়ে। বোখারিতে আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘নবীরা সবাই বৈমাত্রেয় ভাই। তাঁদের মা বিভিন্ন তবে দ্বীন অভিন্ন।’ অর্থাৎ তাঁদের চেতনা-বিশ্বাস এক, তবে বিধিবিধান বিভিন্ন।
আল্লাহর তাওহিদ প্রতিষ্ঠা করা হজ্বের সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। এ আদি ঘরটি নির্মাণই করা হয়েছে তাওহিদ দিয়ে এবং তাওহিদের জন্যই। ‘যখন আমি ইব্রাহিমকে বায়তুল্লাহর স্থান ঠিক করে দিয়েছিলাম যে, আমার সঙ্গে কাউকে শরিক করো না।’ (সূরা হজ্ব : ২৬)।
আল্লাহর বান্দারা, তাওহিদই দ্বীনের ভিত। জাবের (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে মিলিত হবে শিরকবিহীন অবস্থায়, সে জান্নাতে যাবে। পক্ষান্তরে যে তাঁর সঙ্গে মিলিত হবে শিরক করা অবস্থায়, সে জাহান্নামে যাবে।’ (মুসলিম)। এদিকে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থির করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেন। আর তার বাসস্থান হয় জাহান্নাম। অত্যাচারীদের কোনো সাহায্যকারী নেই।’ (সূরা মায়িদা : ৭২)। তাওহিদের বদৌলতে ক্ষমা করা হবে গোনাহ ও পাপরাশি। সুনানে তিরমিজিতে রয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘হে আদমসন্তান! যদি তুমি আমার কাছে পৃথিবীসমান পাপ নিয়ে আস আর আমার কোনো অংশী স্থির না করে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ কর, নিশ্চয়ই আমি সে পরিমাণ ক্ষমা নিয়ে তোমার কাছে আসব।’
হজ্বের আরেক বৃহজ্ব লক্ষ্য আল্লাহর জিকির বাস্তবায়ন করা। এমনকি প্রত্যেকটি ইবাদতই বিধিবদ্ধ করা হয়েছে আল্লাহর জিকির কায়েমের নিমিত্তে। তাই প্রত্যেক ইবাদতেই ওই ব্যক্তির সওয়াব বেশি, যার জিকির বেশি ওই ইবাদতে। তাই তো হাজী সাহেবদের ইহরাম থেকে নিয়ে বিদায়ী তাওয়াফ পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালার জিকিরে থাকতে হয়। সুনানে আবু দাউদে আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘নিশ্চয়ই বাইতুল্লাহর তাওয়াফ, সাফা-মারওয়ার মাঝে সাঈ ও জামারায় পাথর নিক্ষেপের বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে আল্লাহর জিকির কায়েমের নিমিত্তে।’
আল্লাহর বান্দারা, এটাই তো হজ্ব। নির্দিষ্ট কয়েকটি দিন-রাত। যার শুরু আল্লাহর জিকিরে, শেষও আল্লাহর জিকিরে। তাই এতে অবকাশ নেই এর বাইরে গিয়ে গোত্রীয় স্লোগান কিংবা রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের। এটি কেবল আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর প্রতি নিষ্ঠা প্রদর্শনের উপলক্ষ। চিরপ্রশংসিত ও মহাপ্রতাপশালী প্রভুর জিকির উচ্চকিত করার ইবাদত।
‘আর অতঃপর যখন হজ্বের যাবতীয় অনুষ্ঠানক্রিয়া সমাপ্ত করে সারবে, তখন স্মরণ করবে আল্লাহকে, যেমন করে তোমরা স্মরণ করতে নিজেদের বাপ-দাদাদের; বরং তার চেয়েও বেশি স্মরণ করবে। তারপরও কিছু লোক প্রার্থনা করে- হে পরওয়াদেগার! আমাদের দুনিয়ায় দান কর। অথচ তার জন্য পরকালে কোনো অংশ নেই। আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে- হে পরওয়ারদেগার! আমাদের দুনিয়ায়ও কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান কর এবং আমাদের দোজখের আজাব থেকে রক্ষা কর। এদেরই জন্য অংশ রয়েছে নিজেদের উপার্জনের। আর আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।’ (সূরা বাকারা : ২০০-২০২)।

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ

বদলে যাবে মংলা বন্দর

বদলে যাবে মংলা বন্দর

০৩ জুলাই, ২০১৮ ০২:০১













ব্রেকিং নিউজ












হারে শেষ প্রোটিয়াদের লঙ্কা সফর

হারে শেষ প্রোটিয়াদের লঙ্কা সফর

১৬ অগাস্ট, ২০১৮ ০০:৫৭