খুলনা | মঙ্গলবার | ২৩ অক্টোবর ২০১৮ | ৮ কার্তিক ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

বঙ্গবন্ধুর স্বহস্তে স্বাক্ষরিত সনদটি

আমরণ অতিযত্নে রেখেছিলেন স্বাধীনতা যুদ্ধে আহত রফিকুল ইসলাম

নিজস্ব প্রতিবেদক | প্রকাশিত ১৭ অগাস্ট, ২০১৭ ০১:১১:০০

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে দেশ প্রেমের সুমহান আর্দশ ও  প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দেশমাতৃকার মুক্তি সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন অগণিত বাঙালি। নানা পেশা ও নানা অবস্থানে থেকেও সক্রিয় অংশ নেন অনেক দেশপ্রেমিক মানুষ। মৃত্যুকে তাঁরা তুচ্ছ জ্ঞান করেছিলেন। পাক হানাদার দস্যুবাহিনী এবং এদেশে তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। যুদ্ধ করেছেন, প্রাণ উৎসর্গ করেছেন। আবার গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয়েছিলেন অগণতি মানুষ। তাঁদেরই একজন ছিলেন রফিকুল ইসলাম। যিনি সরকারি কর্মচারী হয়েও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলন। অকুতোভয় এই সরকারি কর্মচারী গত ২৩ জুলাই ইন্তেকাল করেন। কিন্তু মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নিজ প্যাডে স্বহস্তে স্বাক্ষরিত একটি সনদ তিনি পরম যতেœর সাথে আগলে রেখেছিলেন। এই সনদে বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষর থাকায় তাঁর কাছে ছিল তা অমূল্য সম্পদ। অথচ তিনি জীবদ্দশায় কোনো দিন এই সনদ দেখিয়ে কোনো সুবিধা নেননি। তিনি বহুবার স্বীয় পুত্র-কন্যা স্বজনদের বলেছেন এ সনদটিতে বঙ্গবন্ধুর স্বাক্ষর রয়েছে। এটি আমার পরম পাওয়া। শুধু এতোটুকু আত্মতৃপ্তি নিয়ে আমৃত্যু তা আগলে রাখেন। এমন একজন দেশপ্রেমিক বঙ্গবন্ধুর অসীম ভক্ত ছিলেন যুদ্ধাহত রফিকুল ইসলাম। প্রচার বিমুখ এ মানুষটির ইন্তেকালের পর জানাজায় শরীক হন এলাকাসহ দূর-দূরান্তের অগণিত মানুষ। তাঁদের মধ্যেই তাঁর সম্পর্কে, তাঁর আদর্শ, দেশপ্রেম ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা ও ভক্তির কথা জানান অনেকে। লোকমুখে তাঁর কথা শুনে আগ্রহ হয় এ ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে। আর এ সাথে বঙ্গবন্ধুর স্বহস্তে স্বাক্ষরিত সেই সনদটি দেখতে। মৃত্যুর পর তাঁর সন্তান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. মোঃ মাহমুদ আলমের সাথে কথা হয়। তিনি জানান তাঁর পিতা গত ২৩ জুলাই বিকেল ৩টায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল  করেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। তাঁকে বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়নের পাতুনিয়াকাঠী গ্রামের বাড়ির মসজিদ প্রাঙ্গনে নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হয়। মৃত্যুর খবর শোনার পর তাঁকে এক নজর দেখা, নামাজে জানাজায় শরীক হওয়া, কবর দেওয়া ও কবর জিয়ারতের জন্য বরিশাল-২ আসনের এমপি ইউনুস তালুকদার, উজিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সেক্রেটারিসহ সকল সদস্যবৃন্দ, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানসহ সকল ওয়ার্ড কমিশনাবৃন্দ, অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও শত শত গুণগ্রাহী এসেছিলেন।
জানা যায়, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় মরহুম রফিকুল ইসলাম চাকুরি করতেন বরিশাল জেলার উজিরপুর থানার পশু চিকিৎসা অফিসে। তিনি দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন (পশু ডাক্তার) এবং  মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তাঁর বয়স ছিল ৩৯ বছর।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে (মে-১৯৭১) কে বা কারা পাক হানাদার দস্যু বাহিনীকে জানিয়েছিলো যে বরিশাল জেলার উজিরপুর থানার গুঠিয়া ইউনিয়নে মুক্তিবাহিনী সংগঠিত হচ্ছে। এই খবর পেয়ে ১৯৭১ সালের ২০ মে পাকহানাদার দস্যু বাহিনী গুঠিয়া ইউনিয়নে আক্রমণ চালানোর জন্য ফজরের নামাজের সময় গুঠিয়া বাজারে গানবোট নোঙ্গর করে। পাকহানাদার বাহিনী গানবোট থেকে ভোরে নেমে সামনে যাকে পেয়েছে তাকেই গুলি করে হত্যা করে এবং মুক্তিবাহিনী কোথায় খুঁজতে থাকে। ঐ এলাকা থেকে তাঁদের বাড়ি প্রায় ২ মাইল দূরে ছিল। এদিন তাঁর পিতা রফিকুল ইসলাম বাড়ি থেকে  বরিশাল যাওয়ার কথা বলে সকালে বের হয়েছিলেন। পথিমধ্যে তাঁকেসহ অনেককে পাকহানাদার বাহিনী ধরে ফেলে। তখন তাঁর পিতা কৌশলে সরকারি চাকুরির পরিচয় দিলে ঐ সময় তাঁকে গুলি না করে ধরে রাখে। কিছু সময় পর উর্দুতে গালি দিয়ে তাঁকে চলে যেতে বলে। তখন তিনি ৪০/৫০ গজ যাওয়ার পরই পেছন থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে স্টেনগানের গুলি ছোড়ে। স্টেন গানের চারটি গুলি তাঁর উরুতে লাগে এবং তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এই ঘটনা ঐদিন দুপুর ১২টা থেকে ১টার মধ্যে ঘটে। তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত জেনে পাক বাহিনী ওই এলাকা ত্যাগ করে। এর পরপরই যারা মুক্তিবাহিনী সংগঠিত করেছিলেন তাদের অনেকেই এগিয়ে আসেন। তাঁরা দেখতে পান রফিকুল ইসলাম তখনও বেঁচে আছেন এবং তিনি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। এ সময় তাদের মধ্যে দুইজন ঘরের চালের একটি ঢেউটিনের ওপর শুইয়ে গুরুতরভাবে আহত রফিকুল ইসলামকে তাঁর বাড়ি নিয়ে যান। বাড়ির সবাই তখন মনে করেছিলেন বোধহয় পাকবাহিনী তাঁকে ধরে মেরে ফেলেছে এবং বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে যায়। কিন্তু তখন তিনি  বেঁচে আছেন এ কথা উচ্চারণ করলে সবাই শান্ত হয়। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসার পর তাঁর অবস্থার অবনতি হলে পরদিন ২১ মে অনেক ঝুঁকি নিয়ে আহত রফিকুল ইসলামকে বরিশাল সদর হাসপাতালে দ্বিতীয় তলায় ২৫নং বেডে ভর্তি করা হয়। ঐ হাসপাতালে নীচ তলায় গুলিবিদ্ধ আহত পাক হানাদার বাহিনীরও অনেকে চিকিৎসাধীন ছিল। রফিকুল ইসলামকে ২৮ দিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাখার পর কিছুটা সুস্থ হলে ওখানকার একজন পরিচিত ডাক্তার বলেন, এই হাসপাতাল ছেড়ে যেতে। কারণ, ঐ হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধা কেউ আহত আছে কি না তা খোঁজ নিতে পারে বা অপারেশন চালাতে পারে। তাই ঐ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ ক্রয় করে তাঁকে বাড়ি নেয়া হয়। সত্যিই এর দুই দিন পর ঐ হাসপাতালে পাকবাহিনী অপারেশন চালিয়েছিল। সেখানে চিকিৎসাধীন মুক্তিকামী যারা একটু ভালো হয়েছিলেন  তাদের অনেককেই ধরে নিয়ে বরিশাল নদীর চরে গুলি করে মেরে ফেলে। সেই সময়ে ১০/১১ বছর বয়েসে হাসপাতালে স্বচক্ষে দেখা সেই স্মৃতিচারণ করে প্রফেসর মাহমুদ আলম বলেন আমি তখন ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ি। এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও আমার পিতার সাথে হাসপাতালে আমি ছিলাম এবং ওষুধপত্র আনতে মাঝে মাঝে নীচে যেতে হতো। তিনি বলেন প্রায়ই পাক হানাদার বাহিনী তাঁকে মুক্তিবাহিনী সম্পর্কিত অনেক প্রশ্ন করতো। প্রতিটি মহূর্তে মৃত্যুর ঝুঁকি সত্ত্বেও পিতার চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে থেকে সব অবলকন করেন। তিনি বলেন সেই ভয়ার্ত সময়ের কথা মনে হলে গায়ের লোম শিউরিয়ে  ওঠে। এর কয়েক মাস পর তার পিতা সুস্থ হয়ে ওঠেন।  অবশেষে আসে  সেই মহান ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। দেশ হানাদার মুক্ত হয়। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয় হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। উল্লেখ্য, তাঁর পিতাকে আহত অবস্থায় যে দু’জন বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন তার একজন ইসরাফিল খান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হন। দ্বিতীয় জন কালা খান এখনও বেঁচে আছেন বলে জানা যায়। এছাড়া তাঁর পিতার অফিসের একমাত্র প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা পাক হানাদার বাহিনীর হাতে শাহাদাৎবরণ করেন।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আহত ও জীবিত মুক্তিযোদ্ধাসহ বরিশাল এলাকার মানুষের সাথে বরিশাল সার্কিট হাউস মাঠে দেখা করতে আসেন। এখান থেকে ফিরে যেয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজ প্যাডে স্বহস্তে স্বাক্ষরিত একখানা সনদসহ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে তাঁর পিতার আর্থিক সহায়তা করেছিলেন। উক্ত সনদের স্মারক নং গচজঋ ৬১ঠ/৭২-ঈউ-৬৬০ তাং ০৩/০৮/১৯৭২ ইং। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বহস্তে স্বাক্ষরিত এই সনদপত্রটিই তাঁর পিতার জীবনে এক অমূল্য সম্পদ হয়ে ওঠে। এটা তিনি পরমযতেœ ধারণ করে রাখেন। তাঁর অনেক কিছুই হারিয়েছে। কিন্তু তিনি এ সনদটি হারাতে দেননি। ওই সনদপত্রে বঙ্গবন্ধু যে ভাষায় লিখেছিলেন তা ছিলো খুবই উচ্চমানের ও অনুপ্রেরণামূলক। বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে লিখেন:
প্রিয় বোন/ভাই,
আপনি দেশপ্রেমের সুমহান আদর্শ ও প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ-মাতৃকার মুক্তি সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে পাক-হানাদার দস্যু বাহিনীর হাতে গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন।
এই দুঃসাহসিক ঝুঁকি নেয়ার জন্য আপনাকে জানাচ্ছি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আপনার মতো নিঃস্বার্থ দেশ- প্রেমিক বীর সন্তানরাই উত্তরকালে আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তার এক অত্যুজ্জ্বল আদর্শ হিসেবে প্রেরণা যোগাবে।
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে আপনার ও আপনার পরিবারের উপকারার্থে আপনার সংশ্লিষ্ট মহকুমা প্রশাসকের নিকট ৫০০/- টাকার চেক প্রেরিত হ’ল। চেক নম্বর ২৯৫২২০।
আমার প্রাণভরা ভালোবাসা ও সংগ্রামী অভিনন্দন নিন।

 

বার পঠিত

পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ














ব্রেকিং নিউজ





যশোরে সাংবাদিক নোভার  আত্মহত্যা

যশোরে সাংবাদিক নোভার  আত্মহত্যা

২৩ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:৫৬