খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২১ জুন ২০১৮ | ৭ আষাঢ় ১৪২৫ |

Shomoyer Khobor

শ্রীলঙ্কা সফরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাফল্য

শেখ সোহেল | প্রকাশিত ২৪ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:২০:০০

শ্রীলঙ্কা সফরে গিয়ে আরো একবার বাংলাদেশ ক্রিকেট দল প্রমাণ করতে সক্ষম হলো যে, সামনের দিকেই এগোচ্ছে আমাদের ক্রিকেট। টেস্ট, ওয়ান ডে এবং টি-২০ সিরিজের তিনটিতেই ড্র করে বাংলাদেশ প্রমাণ করে দিয়েছে এখন ক্রিকেটের সব ফরমেটেই ভালো করতে সক্ষম আমাদের ক্রিকেটাররা। বিশেষ করে সফরে প্রথম টেস্ট ম্যাচে বড় ব্যবধানে হেরেও দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশ যেভাবে ফিরে এসেছে তাতে সারা পৃথিবীর ক্রিকেটবোদ্ধারা প্রশংসা না করে পারেনি। সেটি বাংলাদেশের শততম টেস্ট ম্যাচ হওয়ায় বাংলাদেশের বিজয়টি বিশেষ তাৎপর্যবহ হয়ে ওঠে সকলের কাছে। বাংলাদেশের আগে কেবলমাত্র অস্ট্রেলিয়া, ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং পাকিস্তানই তাদের শততম টেস্টে জয়লাভ করেছিল। বাংলাদেশের এবারের পারফরমেন্সে কুমার সাঙ্গাকারার মত গ্রেট ক্রিকেটারও বলেছেন, ‘সবচেয়ে ভালো হতো যদি সিরিজে আরো একটা টেস্ট থাকতো। সামনে এটা ভেবে দেখা যেতে পারে।’ বাংলাদেশকে টেস্টে দুর্বল দল ধরে নিয়ে জিম্বাবুয়ে ছাড়া এখন পর্যন্ত কোন দেশই ৩ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলেনি বাংলাদেশের সাথে। ভারত তো সম্প্রতি ১ ম্যাচের সিরিজ খেললো বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। কুমার সাঙ্গাকারার কথায় পরিষ্কার যে, টেস্টে বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হতে শুরু করেছে ক্রিকেট গ্রেটদের। নিকট ভবিষ্যতে কোন দেশ বাংলাদেশের সাথে ৩ ম্যাচের টেস্ট সিরিজ খেলতে চাইলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। ২০০৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে নিজেদের শততম ওয়ান ডে-তে ভারতকে ১৫ রানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এবার শততম টেস্টে বাংলাদেশ পেল এক অবিস্মরণীয় জয়। নিশ্চয়ই সমগ্র জাতি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবে শততম টি-২০ তে টাইগাররা কী করে তা দেখার জন্য।
২০১৫ সালের বিশ্বকাপ থেকে একেবারে স্বপ্নের মত সময় কাটছে আমাদের ক্রিকেটারদের। কী করেনি এই সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল! বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেছে, দেশের মাটিতে পাকিস্তানকে হোয়াইট ওয়াশ করেছে, ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে সিরিজ জিতেছে, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে টেস্ট জিতেছে। এর সবগুলোই ছিল প্রথমবারের মতো অর্জন। এরপর অবশ্য নিউজিল্যান্ড সফরে ভালো করতে পারেনি বাংলাদেশ । তবে শ্রীলঙ্কা সফরে আবারও স্বরূপে ফিরে এল বাংলাদেশ। যদিও টেস্ট, ওয়ান ডে এবং টি-২০ সিরিজের তিনটি সিরিজই ১-১ এ ড্র হয় তারপরও সাম্প্রতিককালে নিজেদের মাটিতে শ্রীলঙ্কার রেকর্ড দেখলে বোঝা যায় এই ড্র আসলে জয়েরই শামিল। যে শ্রীলঙ্কা মাত্র কিছুদিন আগে নিজেদের মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে ৩-০ তে হোয়াইট ওয়াশ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ১-১ এ টেস্ট সিরিজ ড্র করাটা মোটেও সাধারণ কোন ব্যাপার নয়। এমনকি ওয়ান ডে সিরিজে যে বাংলাদেশকেই ফেবারিট মনে করা হচ্ছিল-এটাও সাদামাটা কোন ব্যাপার নয়। এখন অন্তত আমাদের ক্রিকেট এমন একটা জায়গায় পৌঁছেছে যে, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল ওয়ান ডে ম্যাচে মাঠে নামা মানেই জয়ের সম্ভাবনা থাকা, সে প্রতিপক্ষ যে দেশই হোক না কেন। এই ইতিবাচক পরিবর্তনটা অন্তত ঘটানো সম্ভব হয়েছে।
টেস্টে বাংলাদেশ যে আস্তে আস্তে ক্রিকেট বিশ্বে জায়গা করে নিচ্ছে তা এখন সকলেই স্বীকার করে নিতে বাধ্য হয়েছেন। যদিও শ্রীলঙ্কা সফরে প্রথম টেস্টে বাংলাদেশ ২৫৯ রানের বড় ব্যবধানে হেরে যায় তারপরও সেই টেস্টে আমাদের ক্রিকেটারদের কিছু ব্যক্তিগত নৈপূণ্য ঠিকই সকলের চোখে পড়েছে। বিশেষ করে খুলনার তরুণ ক্রিকেটার মেহেদি হাসান মিরাজ প্রথম ইনিংসে ৪ উইকেট নেয়ার পাশাপাশি ৪১ রানের একটি ইনিংস উপহার দেন। দ্বিতীয় ইনিংসে মিরাজ আরো দু’টি উইকেট নিলে প্রথম টেস্টে তার মোট উইকেট সংখ্যা দাঁড়ায় ৬টিতে। দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট হাতে মিরাজ করেন ২৮ রান। ফলে প্রথম টেস্টে মিরাজ নিজেকে একজন উদীয়মান অলরাউন্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এর আগে পর্যন্ত মিরাজের সাফল্য ছিলো মূলতঃ বোলার হিসেবে। তবে প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে রঙ্গনা হেরাথ ৩ উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ৫৯ রানে ৬ উইকেট নিলে প্রথম টেস্টে টাইগাররা নিজেদের পরাজয় রোধ করতে পারেনি। কিন্তু দ্বিতীয় টেস্টে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল বিশ্বকে জানিয়ে দিতে সক্ষম হয় কেন বাংলাদেশে ক্রিকেট নিয়ে এতটা মাতামাতি। সেটি আবার ছিলো বাংলাদেশের শততম টেস্ট। তাই সেই টেস্টটি জেতার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় বাংলাদেশের টাইগাররা। আর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বাংলাদেশের টাইগাররা যে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তার প্রমাণ আগেও ক্রিকেট বিশ্ব পেয়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। শততম টেস্টে ৪ উইকেটে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে ঐতিহাসিক টেস্টে স্মরণীয় জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। এই টেস্টের প্রথম ইনিংসে শ্রীলঙ্কার ৩৩৮ রানের জবাবে ৪৬৭ রান করে ১২৯ রানের লিড নিয়ে বাংলাদেশ প্রথম থেকেই নিজেদের জয়ের কক্ষ পথে রাখতে সক্ষম হয়। মিরাজ এই টেস্টেও ব্যক্তিগত সাফল্যের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হন। প্রথম ইনিংসে ৩ উইকেটের পাশাপাশি ব্যাট হাতে করেন ২৪ রান। রানটা হয়তো খুব বেশি নয়। তবে খুলনার এই কৃতি ক্রিকেটার ভবিষ্যতে যে বাংলাদেশ জাতীয় দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ অলরাউন্ডার হয়ে উঠতে চলেছেন সেটা অন্তত আমরা বুঝতে পারছি। এই টেস্টে অভিষিক্ত মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের অনবদ্য ৭৫ রানের ইনিংসও সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। আর বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের তো কোন জবাব নেই। ব্যাট হাতে তিনি করেন ১১৬ রান। প্রথম ইনিংসে ২ উইকেটের পাশাপাশি দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি নেন আরো ৪টি উইকেট। সব মিলিয়ে কেন তিনি বিশ্বসেরা সেটি শ্রীলঙ্কানদের ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে সমর্থ হন। তামিম ইকবাল প্রথম ইনিংসে ৪৯ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ৮২ রান করে বাংলাদেশে জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন। সাকিব আল হাসান নির্বাচিত হন ম্যান অব দ্য সিরিজ।
শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে ১৮তম টেস্টে এসে জয়ের দেখা পেল বাংলাদেশ। দেশের বাইরে এটি বাংলাদেশের চতুর্থ টেস্ট জয়। এর আগে ২০০৯ সালে সেন্ট ভিনসেন্ট টেস্টে ও গ্রেনাডা টেস্টে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছিল বাংলাদেশ। ২০১৩ সালে হারারেতে জিম্বাবুয়ের বিরুদ্ধে টেস্টে জয়লাভ করেছিল বাংলাদেশ।
শততম টেস্ট জয়ের কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখন বাংলাদেশ আর জয়ের জন্য নির্দিষ্ট এক বা দুই জন খেলোয়াড়ের উপর নির্ভরশীল নয়। বরং দল হিসেবে খেলছে বাংলাদেশ। এটিই বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক। বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ভরসার দিক। শততম টেস্টে সাকিব আল হাসান করেছিলেন দুই ইনিংস মিলিয়ে ১৩১ রান এবং উইকেট পেয়েছিলেন ৬টি, তামিম ইকবাল করেছিলেন দুই ইনিংস মিলিয়ে ১৩১ রান, সাব্বির রহমান করেছিলেন ৮৩ রান, মুশফিকুর রহিম করেছিলেন ৭৪ রান এবং ডিসমিসাল করেছিলেন ৫টি, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত করেছিলেন দুই ইনিংস মিলিয়ে ৮৮ রান, সৌম্য সরকার করেছিলেন ৭১ রান, মেহেদি হাসান মিরাজ উইকেট পেয়েছিলেন ৪টি, মোস্তাফিজুর রহমান পেয়েছিলেন মোট ৫টি উইকেট।
এক কথায় আমরা বলতে পারি যে, সবাই কমবেশি অবদান রেখেছিলেন দলের জয়ে। এরপর ওয়ান ডে সিরিজে জয় দিয়ে শুরু করে বাংলাদেশ। ৯০ রানের বড় ব্যবধানে জিতে ১-০ তে এগিয়ে গেলেও শেষ ম্যাচে শ্রীলঙ্কার জয়ে ১-১ এ অমীমাংসিতভাবে ওয়ান ডে সিরিজ শেষ হয় । টি-২০ সিরিজ নিয়ে চিন্তায় ছিল বাংলাদেশ। কারণ এই ফরমেটে এখনো কিছুটা হলেও পিছিয়ে বাংলাদেশ। প্রথম ম্যাচে হেরে গেলেও শেষ টি-২০ তে জিতে টি-২০ সিরিজও ১-১ এ শেষ করে বাংলাদেশ। এই প্রথম শ্রীলঙ্কার মাটিতে তিনটি সিরিজেই অপরাজিত থেকে দেশে ফিরল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এই জয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ফোন করে দলের অধিনায়কসহ একাধিক খেলোয়াড়ের সাথে কথা বলেন, তাদেরকে অভিনন্দিত করেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি তৎক্ষণাত এক কোটি টাকার পুরস্কার ঘোষণা করেন। সারা দেশের মানুষের আশীর্বাদে সিক্ত হয় আমাদের টাইগাররা।
এখন আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর হয়ে চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলতে যেতে পারবে বাংলাদেশ। একটি কথা বলে রাখা ভালো যে, এ বছরটি বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর আইসিসি র‌্যাঙ্কিংয়ে সাতের মধ্যে না থাকলে ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে বাংলাদেশ। অর্থাৎ ২০১৯ সালের ওয়ান ডে বিশ্বকাপে স্বাগতিক ইংল্যান্ড ছাড়া আর ৭টি দেশ সরাসরি সুযোগ পাবে। বাকীদের বাছাই পর্ব খেলে আসতে হবে। শ্রীলঙ্কাকে ওয়ান ডে-তে ৩-০ তে হারালে আইসিসি র‌্যাঙ্কিয়ে শ্রীলঙ্কাকে টপকে ৬ নম্বরে চলে যেতাম আমরা। অনেক নিরাপদ জায়গা হতো সেটা। তারপরও আমাদের ক্রিকেটারদের উপর আমাদের আস্থা রয়েছে। নিজেদের সেরাটা দিতে পারলে যে কোন দলকে হারানো তাদের পক্ষে খুবই সম্ভব।
চ্যাম্পিয়ন ট্রফি শুরু হচ্ছে আগামী ১ জুন থেকে। একটা বড় পরীক্ষা বাংলাদেশের জন্য সন্দেহ নেই। কিন্তু পরীক্ষার ভয়ে মোটেও ভীত নই আমরা। আশা করি, চ্যাম্পিয়ন ট্রফিতে ভালো খেলে টাইগাররা আরো একবার দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে সক্ষম হবে। আমার আগামী লেখায় চ্যাম্পিয়ন ট্রফির উপর আলোকপাত করার ইচ্ছে রইল।
(লেখক : পরিচালক, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড)

 


পাঠকের মন্তব্য (০)

লগইন করুন




আরো সংবাদ




সমাজ ও গ্রন্থাগার

সমাজ ও গ্রন্থাগার

০৫ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ০০:০০


জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

জেরুজালেম ও ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ

১০ জানুয়ারী, ২০১৮ ০০:২৩

এই ছবিটি যেন ‘বিরল’ হয়ে না থাকে

এই ছবিটি যেন ‘বিরল’ হয়ে না থাকে

২১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০







ব্রেকিং নিউজ





এবার যশোরে ব্রাজিল বাড়ি 

এবার যশোরে ব্রাজিল বাড়ি 

২১ জুন, ২০১৮ ০১:০৯

বিশ্বকাপে আজকের খেলা 

বিশ্বকাপে আজকের খেলা 

২১ জুন, ২০১৮ ০১:১৩